কোটা স্থগিত

সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের ওপর আপিল বিভাগের এক মাসের জন্য স্থগিতাদেশ আপাতত কোটা স্থগিত হলেও বিষয়টি নিয়ে চলমান ভুল ধারণা ভাঙ্গছে না। সেই সঙ্গে আদালতের আদেশের পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। তাদের দাবি, কোটা সংস্কারের দাবি না মানা পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন তারা। যদিও কোটা নিয়ে এই আন্দোলনকারীরা যে সকল তথ্য ছড়াচ্ছেন তার মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু ভুল তথ্য। ধারনাবশবত হয়ে এই আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন অনেক শিক্ষার্থীরা যারা সঠিকভাবে জানেন না কোটা ব্যবস্থাপনা কিভাবে ছিলো এবং এটি বাতিলের আদেশ বহাল থাকলে কি অবস্থা দাঁড়াবে।

অনেকেই বক্তব্য প্রদান করছেন, কোটা থাকা ব্যক্তিরা কোন অর্জন ছাড়াই চাকরি পাচ্ছেন। অর্থাৎ তাকে পরীক্ষা দিয়ে টিকে থাকার লড়াই বা মেধার পরিচয় দিতে হচ্ছে না। শুধু কোটার পক্ষে একটা সার্টিফিকেট দেখালেই হলো। কিন্তু এই তথ্যটি সম্পূর্ণই ভুল।

বাস্তবিকভাবে দেখা যায় যেই পরীক্ষাগুলো কয়েক ধাপে হয়ে থাকে, তার প্রতিটি ধাপে পাশ করে একজন কোটাধারীকে মেধা তালিকায় স্থান করে নিতে হয়। হ্যাঁ, মেধা তালিকায় পিছিয়ে থাকার পরও কোটার কারণে সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীকে চাকরি প্রদান করা হয়। কিন্তু মেধা তালিকায় স্থান পেতে তাদের প্রিলিমিনারি, লিখত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাশ করে মেধা তালিকায় স্থান করে নিতে হয়। বিসিএস বা সরকারি অধিকাংশ নন-ক্যাডার চাকরির ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। বিষয়টি প্রযোজ্য দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণীর চাকরির ক্ষেত্রেও। সুতরাং যারা কোটাভুক্ত হয়ে নিয়োগ পান, তাদেরকে ‘মেধাশূণ্য’ বলা অযৌক্তিক। কেননা প্রায় ৭০ শতাংশ পরীক্ষার্থীকে টক্কর দিয়ে তাদের মেধা তালিকায় টিকে থাকতে হয়। অর্থাৎ মেধাবী যেই ৩০ শতাংশ বা তারও কম সংখ্যক শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার সকল ধাপ পেরিয়ে আসেন, তাদের অন্তর্ভুক্ত এই কোটাতে নিয়োগ প্রাপ্ত ব্যক্তিরা।

bcs-preli-prostuti.pngকোটা নিয়ে আরেকটি ভুল ধারণা হলো, ‘কোটা প্রার্থী পাওয়া না গেলে সেই পদগুলো খালিই থেকে যায়।’ কোটা আন্দোলনে অংশ নেয়া এমনকি নেতৃত্ব দেয়া অনেকের মুখেই এমন বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে, সেই পদগুলো অবশ্যই মেধাতালিকার ক্রমানুসারে পূরণ করা হয়। সেজন্যই যখন কোটা প্রথা ছিলো (মেধা ৪৪%, কোটা ৫৬%) তখনো দেখা যেতো প্রায় ৬০-৬৭ শতাংশ পদ পূরণ হতো মেধার ক্রমানুসারে। কিছু কিছু সার্ভিসের জন্য উত্তীর্ণ প্রার্থীদের কেউই যদি চয়েস না দেন তাহলে শুধুমাত্র সেই ক্যাডার সার্ভিস গুলোর কিছু পদ খালি থেকে যেত। সেই পদগুলো পূরণের জন্য মূলক পুনরায় পরীক্ষা নেয়া হয় বা পরবর্তী বিসিএস এর জন্য সেই পদগুলোকে উল্লেখ করে নতুন করে নিয়োগ প্রদান করা হয়।

ubuqizujসুতরাং কোটা থাকায় পদ ফাঁকা রেখে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং মেধাবীদের বঞ্চিত করছে এই ধারণাটিও একেবারেই ভুল। ৫৬ শতাংশ কোটা ঘোষণা করা থাকলেও প্রতিটি বিসিএস বা সরকারি চাকরির থেকে ৩৩-৪০ শতাংশের বেশি কখনই কোটা ভুক্ত নিয়োগ আসেনি। শুধু মাত্র নারীদের জন্য বিশেষ বিসিএস বা নিয়োগ কার্যক্রম ছাড়া মেধাবীদের নিয়োগ না দিয়ে পদ ফাঁকা রাখার রেকর্ড নেই।

ধারণা করা হচ্ছে আদালতের রায়ের পরও কিছু সংখ্যক ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ ধরণের ভুল তথ্য ছড়িয়ে আন্দোলনকে চালিয়ে যেতে চাইছেন। আর এ কারণেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশও বিভ্রান্ত হচ্ছেন।

আরও পড়ুন : কোটা বাতিলের পক্ষে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের পরও আন্দোলন করছে কারা? নেপথ্যে ষড়যন্ত্রের আভাস!

qrঅন্যদিকে কোটা নিয়ে চলমান আন্দোলনে রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করায় জনদুর্ভোগও বাড়ছে। এই আন্দোলনের কারণে অসুস্থ রোগী নিয়েও রাস্তা পার হতে দেয়া হচ্ছে না। রাস্তায় জরুরি কাজে বের হওয়া অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোটা আন্দোলন নিয়ে ভোগান্তির কথা লিখছেন। অনেকেই বলছেন, যারা এভাবে জনভোগান্তি করে আন্দোলন করছে, তারা ভবিষ্যতে সরকারি চাকরি পেয়ে কীভাবে জনগণের উপকার করবে? এখনই তো সাধারণ মানুষকে নিয়ে তাদের কোন পরিকল্পনা নেই। শুধু নিজেদের কথা ভাবছেন তারা। তাহলে সরকারি কর্মকর্তা হলেও তারা শুধু নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন।

[কোটা স্থগিত হলো, কিন্তু রয়ে গেলো কোটা নিয়ে ভুল ধারণা]

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনদুর্ভোগ না বাড়িয়ে শিক্ষার্থীদের উচিত আদালতেই বিষয়টির মীমাংসা করা। কোটা আন্দোলনকারীদের জন্য আদালতের দরজা সব সময় খোলা বলেও জানিয়েছেন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাহী বিভাগের যেকোনো সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে। কোটা আন্দোলনকারীরা তাদের দাবিগুলো আইনজীবীদের মাধ্যমে তুলে ধরতে পারেন। যেটা যেখানে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত সেটা সেখানে নিষ্পত্তি হবে। আদালতে না গিয়ে রাস্তায় থেকে এটা নিষ্পত্তি হবে না। যদি এটা আদালতের বিষয় না থাকত তাহলে কমিশন গঠন করে সমাধান করা যেত।

আরও পড়ুন :