কোটাবিরোধী

সম্প্রতি কোটাবিরোধী যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তা নিয়ে সচেতন মহলে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কোটার কারণে সরকারি চাকরিতে মেধাবীদের মূল্যায়ণ হচ্ছে না বলে আন্দোলনকারীরা যে ন্যারেটিভ ছড়াচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যাচার ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কোটার কারণে বৈষম্য সৃষ্টির দাবিও অবান্তর ও অযৌক্তিক। কারণ কোটা সুবিধা পেতে হলে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয় আর সবার মত। এর আগপর্যন্ত কোটা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা দেয় না।

আসুন একটু ইতিহাস ঘাঁটি।

মুক্তিযুদ্ধের পর শিক্ষা ও প্রশাসনের সর্বত্র পদায়ন হয় সাদা কাপড় পরা বাবুদের, যারা যুদ্ধে যাননি। নভেম্বর-ডিসেম্বরের শীতে বীর মুক্তিযোদ্ধারা যখন মাঠে-ঘাটে প্রাণপণে লড়াই করছেন, অকাতরে জীবন দিচ্ছেন, আহত হয়ে, অঙ্গহীন হয়ে কাৎরাচ্ছেন, তখন সেই বাবুরা আলোয়ান গায়ে জড়িয়ে, ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি দেখে হিসেব কষে বুঝতে পারলেন, মুক্তিযোদ্ধারাই জিতে যাবেন, পাকিস্থান আর থাকবেনা। তখনই সেই বাবুরা প্রস্তুতি নেন। ১৬ই ডিসেম্বরের পর থেকে সেই বাবুরা নানান সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। স্বাধীন দেশে এই বাবুরাই সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন।

ffতবে তাদের নিজেদের মাঝে অস্বস্তি ছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে নিজেদের খর্বকায় লাগত। আধপেটা খেয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেয়া, গামছা মাথায় বেঁধে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবয়ব বিশাল দেখাতো, মাথা উঁচু লাগতো। ফলে খর্বকায় বাবুরা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কোণঠাসা করতে বিভেদের কৌশল নেন, অপপ্রচার চালান। ‘৭৫ পর্যন্ত তবুও বীর মুক্তিযোদ্ধারা সমাজের উচ্চস্থানে ছিলেন। এরপর সবই ফকফকা। শুরু হয় দেশ স্বাধীন করা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন কায়দায় কোণঠাসা করা। আজও সুযোগ পেলে সেই বাবুরা ও তাদের ছানারা সেই কাজটিই করে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নাম শুনলে বাবুদের মাথার পোকা জেগে ওঠে।

আরও পড়ুন : ‘ইউটিউব ভর্তি ডিজইনফরমেশন’ এর মূল সূত্র কোথায় ?

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার মুক্তিযোদ্ধা কোটা চালু করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে যারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, তেমন অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা তখন চাকরি পেয়েছেন৷ তবে খুব একটা উচ্চ পদে যেতে পারেননি। আসলে ৭৫-পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসকরা যেতে দেয়নি। বরং সেসময় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের পুনর্বাসন করা হয়েছে। মন্ত্রী, আমলা থেকে শুরু করে রাজনীতিতেও আসন গেঁড়ে বসে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী, চিহ্নিত রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসসহ দেশবিরোধীরা। মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবারের ওপর নেমে আসে গভীর অমানিশা।

৩৯তম বিসিএস পর্যন্ত কোটা ব্যবস্থা বলবৎ ছিল। ২০১৮ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলনের কারণে সরকার কোটা ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। তারপর ৭টা বিসিএস হয়েছে। কিছুদিন আগে মহামান্য হাইকোর্ট পুনরায় কোটা ব্যবস্থা বলবৎ করতে রায় দেন। আবারও কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সারাদেশে আন্দোলন শুরু হয়। তাদের মূল লক্ষ্য মুক্তিযোদ্ধা কোটা বন্ধ করা। সেজন্য মুক্তিযুদ্ধ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবার নিয়ে অপপ্রচার, হাসি-তামাশা, নোংরামি চালিয়ে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, রাজপথে ও গণমাধ্যমে। অপপ্রচারের ফলে তরুণ প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তৈরি হচ্ছে বিদ্বেষ। নতুন প্রজন্মের মাথায় সচেতনভাবে ঢোকানো হচ্ছে বিষ। যার ফলাফল হবে সুদূরপ্রসারী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের নির্মূল করার লক্ষ্যেই ষড়যন্ত্রের খেলা শুরু হয়েছে।

আরও পড়ুন : ফেসবুকে সরকারবিরোধী গুজবের হিড়িক

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান বা তাদের সন্তানরা কোটার আওতায় এলে “এরা মেধাবী নয়” বলে কোটাবিরোধীরা দাঁত-মুখ খিঁচায়। কিন্তু কোটাবিরোধীরা নিজেরা মেধাবী হলে ঠিকই জানতেন, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরই কোটা সুবিধা পাওয়া যায়। ফলে যারা সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরিতে যোগদান করেন, তারা সবাই মেধা তালিকায় আসা যোগ্য ব্যক্তি। প্রবল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াদের মাঝে নম্বরের পার্থক্যও অতি নগণ্য। মেধা তালিকায় যারা আসেন, তাদের মধ্যে কোটাধারী হাতেগোণা মাত্র কয়েকজন। খুব অল্প নম্বরের সুবিধা পান তারা। মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০% হলেও ৩৯তম বিসিএস পর্যন্ত একবার মাত্র ৮.৫% কোটা পূরণ হয়েছে। অধিকাংশ সময় ২-৩% পূরণ হয়। ফলে কোটার বাকি অংশ পূরণ হয় মেধা তালিকার ক্রম অনুসারে।

bcs-preli-prostuti.pngকিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক। ২০১৮ সালের বিসিএস পরীক্ষায় কোটা অকার্যকর হয়। ২০১৯ সালে ৪০ তম বিসিএস পরীক্ষা হয়। ৪২তম বিসিএস ছিল বিশেষ বিসিএস। করোনার প্রাক্কালে মূলত চিকিৎসক নেওয়া হয় এই বিসিএস-এ। বিসিএস পরীক্ষায় প্রতিবছর ১ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজারের কিছু বেশি ক্যাডার পদের বিপরীতে আবেদন পড়ে ৩-৪ লাখ। MCQ পদ্ধতিতে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা হয়।

২০১৮ সালে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের পর এই তথাকথিত লাখ লাখ মেধাবীর মেধার চিত্র দেখে নিই-

► ৪০ তম বিসিএস পরীক্ষায় ৪ লাখ ১২ হাজার প্রার্থী আবেদন করেন। প্রিলি উত্তীর্ণ হন ২০ হাজার ২৭৭ জন। পাসের হার ৪.৯২%।
► ৪১ তম বিসিএস পরীক্ষায় ৪ লাখ ৭৫ হাজার প্রার্থী আবেদন করেন। প্রিলি উত্তীর্ণ হন ২১ হাজার ৫৬ জন। পাসের হার ৪.৪৩%।
► ৪৩ তম বিসিএস পরীক্ষায় ৪ লাখ ৩৫ হাজার ১৯০ প্রার্থী আবেদন করেন। প্রিলি উত্তীর্ণ হন ১৫ হাজার ২২৯ জন। পাসের হার ৩.৫%।

► ৪৪ তম বিসিএস পরীক্ষায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ৭৬০ প্রার্থী আবেদন করেন। প্রিলি উত্তীর্ণ হন ১১ হাজার ৭৩২ জন। পাসের হার ৪.২৪%।
► ৪৫ তম বিসিএস পরীক্ষায় ৩ লাখ ১৮ হাজার প্রার্থী আবেদন করেন। প্রিলি উত্তীর্ণ হন ১২ হাজার ৭৯২ জন। পাসের হার ৪.০২%।
► সর্বশেষ গত এপ্রিলে ৪৬ তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন ২ লাখ ৫৪ হাজার। প্রিলি উত্তীর্ণ হন ১০ হাজার ৬৩৮। পাসের হার ৪.১৯%।

উপরের চিত্র দেখলে সহজেই বোঝা যায় প্রিলিমিনারিতে কৃতকার্য হওয়া কত কঠিন। এরপর আছে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা। ফলে সকল স্তর পার হয়ে নিয়োগ পাওয়া সব প্রার্থীই মেধাবী। মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি আদৌ মেধাবী হয়ে থাকেন, তবে এই সহজ হিসাব না বোঝার কথা নয়। আদৌ কি তারা বোঝেন না, নাকি বুঝেও বিশেষ উদ্দেশ্যে অপপ্রচার চালাচ্ছেন, তা খতিয়ে দেখার বিষয়। আদালতের রায় মনপুত না হলেও আইনের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু তারা সেই প্রক্রিয়ায় না গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এজেন্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত হয়েছেন। তাদের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছেন।

[কোটাবিরোধী আন্দোলন নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে]

এর আগে ছাত্র অধিকার পরিষদের ব্যানারে ভিপি নূর, রাশেদসহ কোটাবিরোধীরা যে আন্দোলন করেছিলেন, তার ফলেই কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। সেই নূর, রাশেদসহ তাদের সঙ্গীরা পরবর্তী কোটাহীন বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে লিখিত পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। পরবর্তীতে তারা সেই পরিচিতি কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক দল গড়ে রাতারাতি শত শত কোটি টাকার মালিক বনে যান। এতেই বোঝা যায়, কোটাবিরোধী আন্দোলন মূলত মেধাবীদের যথাযথ মূল্যায়নের লক্ষ্যে নয়। তাদের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী শক্তিকে আবারও সামনে আনার চেষ্টা করছেন। যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য এক অশনি সংকেত। প্রজন্মকে তাই এখনই সতর্ক হতে হবে। যেন নিজেদের মেধা ও যোগ্যতা দেশবিরোধীদের অস্ত্রে পরিণত না হয়।

আরও পড়ুন :