ট্রানজিট

এই নিয়েছে ঐ নিলো যা, কান নিয়েছে চিলে কানের পিছে ঘুরছি এখন আমরা সবাই মিলে। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লাখ শহীদ ও লাখ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভোমত্ব নাকি হুমকি মুখে পড়েছে। আমি বলছি না, দেখেন মির্যা ফখরুল সাহেব সহ বিএনপি নেতারা কি বলছে

মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের লিংক : https://www.youtube.com/watch?v=V-21VkEuk00 (০০:০০-০০:১২)
রিজভীর বক্তব্যের লিংক : https://www.youtube.com/watch?v=7ZtsVNuwWiM (০০:৩৮-০০:৪৪)

অবশ্য রিজভী সাহেব অনেক কথার মধ্যে একটি সত্য কথাও বলেছেন। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে এমন ট্রানজিট করা কখনও হতো না। https://www.youtube.com/watch?v=7ZtsVNuwWiM (০০:০০-০০:০৪)। হবে কিভাবে বলুন। যেই বিএনপি-জামায়াত সরকার নিজ দেশের পাশাপাশি ভারতে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাবার জন্য ১০ ট্রাক অস্ত্রের মত চালান পাঠায়। সেই সরকারের সঙ্গে কোন দেশের সরকার বসে আলোচনা করবে! (দশ ট্রাক অস্ত্রের ফুটেজ – https://youtu.be/UurwgAE6jRI)

সে যাই হোক। আসুন জেনে নেই ট্রানজিট ও রেল ট্রানজিট সম্পর্কে :

ট্রানজিট ও রেল ট্রানজিট

ট্রানজিট সুবিধার জন্য প্রত্যেক দেশের আন্তর্জাতিক কিছু বিধিবিধান মেনে চলতে হয়। এর জন্য রয়েছে- বার্সেলোনা ট্রানজিট কনভেনশন-১৯২১ (https://treaties.un.org/doc/Publication/UNTS/LON/Volume%207/v7.pdf : এখানে পৃষ্টা ১৩ ) ও নিউইয়র্ক ট্রানজিট কনভেনশন-১৯৬৫ (https://lawcommission.gov.np/en/wp-content/uploads/2021/01/1965-Convention-On-Transit-Trade-Of-Land-Locked-States.pdf)।

এবাদেও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড (গ্যাট) দলিলের পঞ্চম ধারায় (আর্টিকেল-৫)-এ ‘ট্রানজিটের স্বাধীনতা’ (https://www.wto.org/english/docs_e/legal_e/gatt47_01_e.htm#:~:text=Article%20V%3A%20Freedom%20of%20Transit&text=traffic%20in%20transit%E2%80%9D.-,2.,territory%20of%20other%20contracting%20parties) ও রীতি-নীতির উল্লেখ রয়েছে, যা ডব্লিউটিওভৃক্ত সব সদস্য দেশের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য।

বার্সেলোনা কনভেনশনে দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের মধ্যে ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষরের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। নিরাপত্তার বিবেচনায় ট্রানজিট সুবিধা সীমিত করার সুযোগও এ কনভেনশনে নিশ্চিত করা হয়েছে। বার্সেলোনা কনভেনশন অনুসারে, ট্রানজিটের বিপরীতে কোনো শুল্ক আদায়ের সুযোগ নেই। তবে এই পণ্য পরিবহনের অবকাঠামো ব্যবহার, তা রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ইত্যাদির সেবার জন্য মাশুল আদায় করা যাবে। (https://treaties.un.org/doc/Publication/UNTS/LON/Volume%207/v7.pdf : এখানে পৃষ্টা ১৩ স্ক্রল করে সেখান থেকে মূল পয়েন্টগুলো জুম ইন করে মার্কার দিয়ে দেখাতে হবে)

গ্যাটের পঞ্চম ধারার ৩ থেকে ৬ উপধারার শর্ত অনুসারে দুই ভাগে মাশুল আদায় করা যায়। এক- পণ্য প্রবেশ ও বহির্গমন পয়েন্টে বিভিন্ন সেবার বিনিময়ে মাশুল ও সার্ভিস চার্জ আদায় ও দুই- ট্রানজিট পণ্যবাহী যানবাহনের ওপর নিবন্ধন ফি, শুল্ক ও কর, টোল ইত্যাদি অথবা মাশুল আদায়। স্থানীয় পরিবহন ও ট্রানজিট পরিবহনের জন্য এসব ফি একই হারে প্রযোজ্য হবে।  (https://www.wto.org/english/docs_e/legal_e/gatt47_01_e.htm#:~:text=Article%20V%3A%20Freedom%20of%20Transit&text=traffic%20in%20transit%E2%80%9D.-,2.,territory%20of%20other%20contracting%20parties গ্যাটের আর্টিকেল ৫ এর ৩ থেকে ৬ ধারা পর্যন্ত হাইলাইট করে জুম করে দেখাতে হবে)

এত ছিলো ট্রানজিটের আন্তর্জাতিক বৈধতা নিয়ে কথা। আসনু বিশ্বের বুকে গড়ে ওটা দুর্দান্ত সব রেল, জল বা সড়ক পথের ট্রানজিটের কথা জেনে নেই।

বিশ্বের বুকে গুরুত্বপূর্ণ যত ট্রানজিট

mapa-europa-politico-con-nombresঐতিহাসিকভাবেই শতাব্দীর পর শতাব্দী দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত থেকেছে ইউরোপিয়ান দেশগুলো। এমনকি আধুনিক সময়ে এসেও দুই দুটি বিশ্বযুদ্ধে ছারখার হয়েছে ইউরোপ। মহাদেশটির দুই পরাশক্তি ব্রিটেন এবং ফ্রান্স প্রায় দুশ বছর ধরে যুদ্ধ করার পরও নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়েছে। প্যারিস থেকে ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে লন্ডন যাচ্ছে দ্রুতগতির ট্রেন। এমনকি ব্রিটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে গেলেও কানেকটিভিটি ছিন্ন করেনি।

আর বর্তমানের ‘বর্ডারলেস’ ইউরোপ তো বাকি বিশ্বের জন্য উদাহরণ। যেখানে আইসল্যান্ড, লিচটেনস্টাইন, নরওয়ে এবং সুইজারল্যান্ডসহ ইইউভুক্ত ২৭টি দেশের নাগরিকরা কোনো বাধা ছাড়াই ইউনিয়ন ভুক্ত দেশে যাতায়াত করতে পারে। অর্থাৎ স্ক্যান্ডিনেভিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর এবং কৃষ্ণ সাগর থেকে আটলান্টিক সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাজুড়ে অবস্থিত দেশগুলো বর্ডারের গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকেও স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। অবাধ ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে নাগরিকদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। এমন অবস্থা এশিয়া বা দক্ষিণ এশিয়ায় কি কখনই গড়ে উঠবে না? নাকি আমাদের সেই স্বপ্ন দেখারই অধিকার নেই!

আমেরিকা মহাদেশেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে সড়ক পথ ও রেলপথ ধরে কানাডায় যাতায়াতা সম্ভব। অ্যামট্রাক নামের একটি রেলসেবার মাধ্যমে আমেরিকা থেকে কানাডার লোকজন দুই দেশে যাতায়াত করছেন।

শুধু ইউরোপ আমেরিকা নয় এশিয়াতেও আছে শক্তিশালী রেল ট্রানজিটের উদাহরণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় লাওস-চীন, থাইল্যান্ড-লাওস সরাসরি রেল যোগাযোগ রয়েছে। মঙ্গোলিয়া, চীন এবং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক রয়েছে। গত বছর রাশিয়া ও ইরান আজারবাইজান হয়ে নতুন রেল ট্রানজিট নিয়ে সম্মত হয়। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও এই দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা এক্সপ্রেস, থর এক্সপ্রেস নামের দুটি ট্রেন চলাচল করে।

আফ্রিকান ইউনিয়নও ২০৩৩ সালের সালের মধ্যে মহাদেশ জুড়ে রাজধানীগুলোকে সংযুক্ত করার জন্য একটি বিশাল, আধুনিক রেল নেটওয়ার্ক তৈরি করার পরিকল্পনা করেছে।

আচ্ছা শৈশবে তো বইয়ে সুয়েজ খালের নাম অনেক পড়েছেন মনে হয়। তাই না? (https://www.youtube.com/watch?v=5pfrK85ic9s ফুটেজে সুয়েজ খাল দেখাতে হবে ) পানামা খালের কথাও একইরকম ভাবে হয়তো শুনেছেন (https://youtu.be/m8TkcWhmByg)। বাংলায় খাল বলা হলেও এগুলো আদতে একেকটা ট্রানজিট পয়েন্ট। মিসরের সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত একটি কৃত্তিম সামুদ্রিক খাল হলো সুয়েজ। এটি সুয়েজের ইস্তমাসের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরকে লোহিত সাগরের সাথে যুক্ত করেছে এবং আফ্রিকা ও এশিয়াকে বিভক্ত করেছে। খালটি সিল্ক রোডের অংশ যা ইউরোপকে এশিয়ার সাথে সংযুক্ত করে। মিসরের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

SCএই ট্রানজিট পয়েন্ট থেকে মিসর বছরে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার নগদ আয় করে, যা তার আয়ের তৃতীয় বৃহত্তম উৎস। (উপরের লিংক থেকে সুয়েজ খালের ফুটেজ বা অন্য স্থান থেকে সুয়েজ খালের ফুটেজ ব্যবহার করতে হবে।) শুধু তাই নয়, বিশ্বের মোট বাণিজ্যের ১২ শতাংশ হয় এই খাল দিয়ে। অধ্যাৎ সারা বিশ্ব এই খাল দিয়ে বাণিজ্য করে। তবে কি বিশ্বের সকল দেশের কাছে মিশর বিক্রি হয়ে গেছে! এমন আজগুবি কথা কেউ কখনও বলেনি।

এবার আসুন পানামা খালের গুরুত্ব শুনি। পানামা খাল মানুষের তৈরি জলপথ। এটি আটলান্টিক এবং প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্ত করে। ফলে অল্প সময়ে বেশি দূরত্ব পাড়ি দেয়ার জন্যে এটি সামুদ্রিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। কেননা, দুটি মহাসাগরের মধ্যে জাহাজ ভ্রমণের দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে পানামা খাল। খালটি ১৯১৪ সালের ১৫ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেয়া হয়। বিংশ শতাব্দীর শেষ অবধি খালটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৭৭ সালে পানাম খাল চুক্তি সই হয়। ধীরে ধীরে এর নিয়ন্ত্রণ পানামার হাতে যেতে থাকে। ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর খালের পুরো নিয়ন্ত্রণ পানামার হাতে চলে যায়। এই জলপথে বছরে ২৭০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য পরিচালিত হয়। (পানামা খালের ফুটেজ ব্যবহার করতে হবো)

BDএবার আসি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। একটু বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের মানচিত্রটার দিকে তাঁকান প্লিজ।। বিশ্ব স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের খুব সামান্য পরিমাণে মিয়ানমারের সঙ্গে বর্ডার ছাড়া পুরো দেশের সড়ক সীমান্ত ভারতের সঙ্গে। এবার একটু আমরা বোঝার চেষ্টা করি এই ট্রানজিট কিভাবে দক্ষিণ এশিয়াকে গ্লোবার ভিলেজের অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। পূর্বের একটি ট্রানজিট পয়েন্ট সহ বাংলাদেশের সঙ্গে মোট ৭টি পয়েন্টে রেলওয়েতে যুক্ত হচ্ছে ভারত। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলাদেশের একটি বড় আমদানির বাজার ভারত থেকে। সেখানে দেশটির সঙ্গে রেলপথ যত সহজ হবে, তত দেশে ভারতের পণ্য কম মূল্যে বিক্রি করা যাবে। তবে সেটা মুখ্য বিষয় নয়।

আসুন একটু ট্রানজিট পয়েন্টগুলো দেখি। কি মনে হচ্ছে? আসলে সমগ্র এশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সহজ রেল সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ভারত। আর এ কারণেই নেপাল, ভুটান বা আমাদের অপর আমদানির বড় বাজার চীনের সঙ্গে রেলে যুক্ত হতে গেলেও ভারতের বিকল্প নেই। আর ট্রানজিট পয়েন্টগুলো দেখলে এ বিষয়টি খুব স্পষ্ট হবে যে, ভারত মোটা দাগে সব দিক থেকেই আমাদের সংযোগ স্থাপনের বিষয়ে সহমত পোষণ করেছে। ভারত-বাংলাদেশের এই ট্রানজিট দক্ষিণ এশিয়ায় অবিশ্বাস ও ভেদাভেদের কূটনীতির বদলে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মত একতাবদ্ধ বাণিজ্য কার্যক্রমের জন্য প্রতিবেশি সকল রাষ্ট্রকে অনুপ্রেরণা প্রদান করে।

এই ট্রানজিটের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরবর্তীতে পূর্ব এশিয়ে ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও রেল ট্রানজিটে যুক্ত হবার স্বপ্ন দেখতে সক্ষম হচ্ছে। বলা যায় গ্লোবাল ভিলেজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে অনেকগুলো একসেস পয়েন্ট অর্জন করেছে। নিশ্চিতভাবেই ভারতও এই সংযোগের মাধ্যমে লাভবান হয়েছে। দিন শেষে ভবিষ্যৎ কানেক্টিভিটির কথা চিন্তা করলে এটা তো উইন-উইন সিচুয়েশন। তাহলে কেনো বিএনপি-জামায়াত সহ তাদের নেতা-কর্মীদের কাছে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিক্রি হয়ে যাচ্ছে?

[ট্রানজিট নিয়ে রাজনীতি : কান নিয়েছে চিলে]

আসল ঝামেলাটা সম্ভবত অন্যখানে। শেখ হাসিনার পরিকল্পনা অনুসারে দেশের উন্নয়নের জন্য যেভাবে বিরোধিতা ও ষড়যন্ত্রের পরও পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে তাতে এই গোষ্ঠিটি সম্ভবত ভয় পাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত এশিয়ায় ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটির ক্ষেত্রে অগ্রগামী ভূমিকা রাখা দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গুরুত্ব পাবে। সেই সঙ্গে সকল চ্যানেল দিয়েই বাংলাদেশের সঙ্গে অভূতপূর্ব এক বাণিজ্যিক কানাক্টেভিটি তৈরি হবে। তখন আর শেখ হাসিনার বিরোধিতা করার সুযোগ থাকবে না। তাই পদ্মা সেতু নির্মাণের আগে যেভাবে বিএনপি-জামায়াত ও তাদের পন্থী সুশিলগণ কথা বলেছেন, এখনও বাংলাদেশ-ভারত ট্রানজিট নিয়ে তারা ‘কান নিয়েছে চিলে’ বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। দেশের সার্বভৌমত্ব কোন কোন পয়েন্টে নষ্ট হয়েছে এই ট্রানজিটের মাধ্যমে, সে বিষয়ক কোন স্পষ্ট বক্তব্য পাবেন না উনাদের কারোর কাছে। কেননা উনারাও নিজেরাও জানেন না আসলে কি কারণে এই ট্রানজিটের বিরোধিতা তারা করছেন।

আরও পড়ুন :