বাংলাদেশ-গণমাধ্যম

লবিস্ট ফার্মের মাধ্যমে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে অংশ নিতে বহুদিন আগেই সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ঢোকানো হয় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব মুশফিকুল ফজল আনসারীকে। মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ বৃথা যায়নি তাদের। প্রতিনিয়ত বাংলাদেশকে বিতর্কিত করতে দেশের অভ্যন্তরীণ এবং মার্কিন স্বার্থ বহির্ভূত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সেখানে প্রশ্ন করেন বিএনপি-জামায়াতের গুজব সেলের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য মুশফিকুল ফজল আনসারী। শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার, ভুয়া ও গুজবী অপতথ্য নির্ভর বয়ান, দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বক্তব্য জানতে চাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির জন্যই এই গুজববাজকে প্ল্যান্ট করা হয়েছে সেখানে।

যেহেতু প্রশ্নের জবাব দেওয়াই মুখপাত্রদের কাজ, তাই কখনো কখনো এসব অবান্তর প্রশ্নের একটা দায়সারা জবাব দেয় স্টেট ডিপার্টমেন্ট, কখনো মার্কিন সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হয়। আর সেই জবাব দেওয়া ভিডিও কাটছাঁট করে বা বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা শিরোনাম দিয়ে ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়ানো হয় বাংলাদেশি নাগরিকদের মিসগাইড বা প্যানিক সৃষ্টি করতে। এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় বক্তব্যগুলোকে, যেন মার্কিন সরকার বাংলাদেশ নিয়ে কঠোর মনোভাব দেখাচ্ছে। আর এমন অযাচিতভাবে দেশের নিজস্ব বিষয়ে বিদেশিদের মতামত জানতে চাওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের সকল বিষয়ে মার্কিনিদের খবরদারি বা নাক গলানোর একটা সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে ভুয়া সাংবাদিক আনসারী।

সম্প্রতি সাংবাদিকদের দায়িত্বশীলতা ও গণমাধ্যম নীতিমালার বিষয় উল্লেখ করে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন একটি বিবৃতি দেয়। যার উদ্দেশ্য ছিল অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নামে যেন কোনো নিরাপরাধ ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন না করা হয়, যেন তথ্য-উপাত্ত ছাড়া কারো বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করার মাধ্যমে পুলিশ বিভাগকেই জনগণের কাছে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা না হয়। সংবাদমাধ্যমগুলোকে নীতিমালা মেনেই সংবাদ করার অনুরোধ করা হয়েছিল বিবৃতিতে। আর এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে অনেক সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী অপপ্রচার চালাচ্ছে, দাবি করছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরন করতেই নাকি পুলিশ হুমকি-ধমকি দিচ্ছে! যা একেবারেই অনভিপ্রেত।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রায় সকল দেশেই সংবাদমাধ্যমগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংবাদ পরিবেশন করে, যেন কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি জনরোষের শিকার না হন, অপপ্রচারের লক্ষ্যবস্তু না হন। কারো অপরাধের বিষয়ে কোনো সংবাদ করলে যেন যথাযথ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই করা হয়, সেই আইন রয়েছে। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম ও সংবাদকর্মীকে মানহানির দায়ে কারাবরণসহ বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। এসব আইনের ফলে নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানি থেকে মুক্ত থাকেন।

বিশ্বের অনেক বড় বড় গণমাধ্যম ও নামকরা সাংবাদিক এমন জেল-জরিমানা দিয়েছেন মানহানির কারণে। কিন্তু আমাদের দেশে এসবের কোনো বালাই নেই। চাইলেই যে কেউ যা খুশি লিখতে পারছে। মিথ্যা প্রমাণ হলে দুঃখ প্রকাশ করে সংবাদ প্রত্যাহার করে নিলেই খালাস। এভাবে শুধুমাত্র অপদস্থ করতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করে পরে সরিয়ে নিয়ে দুঃখপ্রকাশ করে দায় সারার অসংখ্য উদাহরণ আছে খোদ প্রথম আলোর মত পত্রিকার বিরুদ্ধেই। যে কারণে পত্রিকাটির সম্পাদক মতিউর রহমানকে ‘তওবা সম্পাদক’ আখ্যা দিয়েছিলেন প্রয়াত লেখক-সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী। এসব অপরাধকে বাংলাদেশে অপরাধ হিসেবে গণ্যই করা হয় না।

Matthew_Miller,_DOS_Spokespersonপুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সেই বিবৃতিকে সাংবাদিকদের প্রতি হুমকি-ধমকি উল্লেখ করে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলারের কাছে জানতে চাওয়া হয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এসব হুমকি মোকাবেলা ও দুর্নীতি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নেবে?। তখন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত না জানা মিলার বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে বলেন, সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকে বিরত রাখতে হয়রানি বা ভয়ভীতি দেখানোর যে কোনো প্রচেষ্টায় আমরা আপত্তি জানাই। ব্যস, এতেই উদ্দেশ্য সফল আনসারীর। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটা বক্তব্য বের করে আনতে পারাটাই ছিল তার মিশন।

আরও পড়ুন : সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা নিয়ে ভুয়া তথ্য দিয়ে ধরা খেলো মুশফিক ফজল আনসারী

মিলারের বক্তব্যে মনে হওয়া স্বাভাবিক, যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে সংবাদকর্মীদের স্বর্গরাজ্য, এখানে যেকোনো সাংবাদিক ইচ্ছেমত লেখার স্বাধীনতা ভোগ করে, কোনো সাংবাদিক এখানে নির্যাতিত হয় না, কাউকে খবরদারি করা হয় না, হুমকি-ধমকি নেই। কিন্তু আসল পরিস্থিতিটা কী? আসুন দেখা যাক।

যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকদের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। মার্কিন সংস্থা প্রেস ফ্রিডম ট্র্যাকারের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালের প্রথম ৩ মাসে দেশটিতে ১৪ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য, নিপীড়ন ও হুমকি-ধমকির শিকার হয়েছেন। যাদের ৫ জনকে শারীরিক আক্রমণের শিকার। ২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হুমকি দেয়া হয়েছে ১ জনকে। তথ্য চেয়ে পেতে ব্যর্থ হয়েছেন ২ জন। কাজে বাধা দেয়া হয়েছে ২ জনকে। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সরাসরি হামলার শিকার হয়েছেন অন্তত ৪০ জন, কাজে বাধা দেয়া হয়েছে ১০ জনকে। আদালতের মুখোমুখি হতে হয়েছে ৩০ জনকে।

যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ২০২০ সালে। সে বছর ১৪৫ জন গ্রেপ্তার বা মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। হামলার শিকার হয়েছেন ৬৩১ জন। ২০২১ সালে মামলা বা গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হয়েছেন ৫৯ জন। এরমধ্যে গ্রেপ্তার হন ৫৬ জন। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৩ সালের প্রথম ৩ মাসের হিসাব আমলে নিলে বিগত ৫ বছরে মামলা কিংবা গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন ২৮৩ জন। সরাসরি হামলার শিকার হন ৯৬৪ জন। তথ্য চেয়ে পেতে ব্যর্থ হন ৭৬ জন সাংবাদিক। হামলার কারণে সাংবাদিকতার কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে ২০৩ জনের। আদালতের নোটিশের মুখোমুখি হয়েছেন ১৬৭ জন। দেহ তল্লাশি ও সরঞ্জাম কেড়ে নেয়া হয়েছে ৮৩ জনের। পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকদের অবস্থা যতটা ভালো ভাবা হয় বাইরে থেকে, ভেতরে ততটা ভালো নয়।

এই অবস্থায় নৈতিকভাবে বাংলাদেশের মতো দেশের বেলায় যুক্তরাষ্ট্র সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতার সবক দিতে পারে কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে ২০২১ সালে কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস বা সিপিজে’র নির্বাহী পরিচালক জোয়ের সাইমন বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের হাতে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও আটকের জন্য সুস্পষ্ট কোনো কারণ লাগে না। ২০২১ সালে এ ধরনের ৫৬টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায় সমস্যাটি বিশাল আকার ধারণ করেছে।

floyd-police-custodyযুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েড হত্যার ঘটনার বিচার চেয়ে চলমান আন্দোলন ও বিক্ষোভে সাংবাদিকদের ওপর দেশটির পুলিশ প্রায় ৯০ বার হামলা চালিয়েছে [সূত্র: প্রেস ফ্রিডম ট্র্যাকার]। সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে সরাসরি রাবার বুলেট ছুঁড়েছে পুলিশ। এমনকি এই আন্দোলন কাভার করতে আসা দেশি-বিদেশি সাংবাদিকরাও দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ও মরিচ গুঁড়া নিক্ষেপের শিকার হন। পরিচয়পত্র দেখানোর পরও পুলিশ তাদের ওপর হামলা করে পুলিশ। সে বছরই লাইভ চলাকালে মিনেসোটা পুলিশ সিএনএন-এর সাংবাদিক ও ক্রুদের গ্রেপ্তার করে। এ সময় বারবার গ্রেপ্তারের কারণ জানতে চাইলেও কোনো উত্তর দেয়নি পুলিশ। টিভি লাইভে দেখা যায় একে একে সাংবাদিক ও ক্রুদের হাতকড়া পড়িয়ে আটক করছে পুলিশ।

মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীটি মুক্ত গণমাধ্যমের নিশ্চয়তা দিলেও তা মানা হয় না। মার্কিন সরকার গণমাধ্যমের তথ্যের গোপন উৎস বের করতে সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত ফোন এবং ই-মেইল রেকর্ড জব্দ করে অহরহ। অথচ তারাই বাংলাদেশে সচিবালয়ে ঢুকে রাষ্ট্রীয় স্পর্শকাতর নথি চুরি করে হাতেনাতে আটক হওয়া প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনার পক্ষ নেয়! যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক বিভিন্ন সংস্থা রোজিনাকে পুরস্কারও দিয়েছে।

obama-trump-bidenসাংবাদিকদের ব্যক্তিগত ডিভাইস ও যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্যে হস্তক্ষেপ এবং বাজেয়াপ্তের মার্কিন এই কৌশল ওবামা, ট্রাম্প, বাইডেনসহ সকল সরকারের সময় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটা সাংবাদিকদের নিপীড়নের একটি ঘৃণ্য কৌশল হিসেবে স্বীকৃত। এই মার্কিন সরকারই গোপনীয় তথ্য ফাঁসের অজুহাতে উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন চালিয়েছে। রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হলেও অ্যাসাঞ্জকে মার্কিন প্রশাসনের চাপে অন্য দেশে অন্যায়ভাবে অ্যাসাঞ্জকে আটকে রাখা হয়েছে বহুদিন ধরে।

এসব পরিসংখ্যান প্রথম আলো বা ডেইলি স্টারের মত মার্কিন মদদপুষ্ট গণমাধ্যমে কখনই প্রকাশিত হয়নি, হবেনা। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংস্থাগুলোর সাথে কারওয়ান বাজারের এই সাংবাদিক সর্দারদের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। যারা বিভিন্ন স্বার্থে পরস্পরের পিঠ চুলকে ফায়দা আদায় করে। গণমাধ্যমকর্মীদের নেতিবাচক ও গুজব প্রচারে উৎসাহিত করে জনরোষ সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষমতায় নিজেদের পছন্দমাফিক পুতুল সরকার বসানোর লক্ষ্যে একইসাথে কাজ করছে মার্কিন বিভিন্ন সংস্থা এবং বাংলাদেশি এই গণমাধ্যমগুলো। তাদের ইন্ধনেই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কূটকচালি করছে মুশফিকুল ফজল আনসারীরা।

[বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সবক দেয় সাংবাদিক নির্যাতনকারী মার্কিন প্রশাসন!]

পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিকে হুমকি-ধমকি আখ্যা দিয়ে দেশের সংবাদকর্মীদের উস্কে দেওয়া হচ্ছে। আবার সাংবাদিক নির্যাতনকারী মার্কিনি প্রশাসনের হস্তক্ষেপও কামনা করা হচ্ছে বাংলাদেশের ওপর। এসবই একটা নির্দিষ্ট ছক অনুসারে ঘটানো হচ্ছে। দেশবিরোধী চক্র আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বাংলাদেশকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরতেই এ কাজটি করছে।

আরও পড়ুন :