বিশ্ব-মেটা

বিশ্বজুড়ে নিজেদের বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে ব্যর্থ মার্কিন টেক জায়ান্ট মেটা ও তার ফেসবুক প্লাটফর্ম। প্লাটফর্মটির পক্ষ থেকে নির্দিশিকা মেনে চলা ও ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের ক্ষেত্রে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানের ইউরোপে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে ঐ অঞ্চলের স্থানীয় আইন ও নির্দেশিকা অনুসারে। ব্যক্তিগত বা জাতিগত ঘৃণা প্রচার বন্ধ বা ফ্যাক্ট চেকিং এর জন্য মেটা তার নিজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করলেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশেও বার বার ব্যর্থ হয়েছে টেক জায়েন্ট প্রতিষ্ঠানটি। ঘৃণামূলক বক্তব্য বন্ধ বা জননিরাপত্তার জন্য হুমকি জনক তথ্য প্রচার বন্ধে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে ফেসবুক। বাংলাদেশে একাধিক সাম্প্রদায়িক হামলার জন্ম হয় ফেসবুক প্লাটফর্ম থেকে। সেই সঙ্গে প্যালেস্টাইনে চলমান গণহত্যার মধ্যেও ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে প্যালেস্টাইন বিরোধী এবং ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা গেছে।

আরও পড়ুন : ‘ইউটিউব ভর্তি ডিজইনফরমেশন’ এর মূল সূত্র কোথায় ?

সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অতীত সম্পর্কে কোন রকম পূর্ব তথ্য ছাড়াই ফেসবুক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যেখানে এক তরফাভাবে বলা হয়েছে- বিএনপির দুর্নীতি, নির্বাচনের আগে জ্বালাও-পোড়াও এবং বিএনপি নেতাদের নিয়ে সমালোচনার কারণে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ মেটা একাধিক অ্যাকাউন্ট ও পেজ বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও একাধিক জ্বালাও-পোড়াও কার্যক্রমে বিএনপি নেতাকর্মী ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্ট থাকার প্রমাণ সরাসরি মিলেছে। সেই সঙ্গে বিএনপি শাসনামলে তারেক রহমান ও কোকোর অর্থপাচার নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এর সাক্ষ্য ও সিঙ্গাপুর পুলিশের তথ্য থাকা সাপেক্ষে দেশের আদালতে দুইজন দুর্নীতির দায়ে দোষী প্রমাণিত হলেও বিষয়টি ফেসবুক ‘বিএনপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি অভিযোগ’ প্রচার হিসেবে বর্ণনা করেছে যার মাধ্যমে বোঝা যায় মেটার নিজস্ব তদন্ত যারা করেছেন তারা স্পষ্টতই পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছেন বিএনপির পক্ষে।

জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এ সকল দুর্নীতির প্রতিবেদন দেশের সকল গণমাধ্যমে ২০০১-০৮ সালের মধ্যে একাধিকবার প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু এই বিষয়গুলো আমলে নেয়া হয়নি মেটার ‘নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনে’।
তবে এই বিষয়গুলি উপেক্ষা করে, মেটা ও তার তদন্তকারীদের বর্ণিত ব্যাখ্যাকে স্পষ্টভাবেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মেটা এখানে স্পষ্টভাবে একটি দলের পক্ষে সাফাই গেয়েছে এবং সেই দলের অফিসিয়াল পেজ থেকে প্রকাশিত সকল গুজব, সমালোচনা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিষয়ে কোন বক্তব্য প্রদান ছাড়াই এককভাবে একটি রাজনৈতিক দলকে দায়ী করেছে, যা স্পষ্টভাবেই পক্ষপাতমূলক আচরণ।

সন্ত্রাসী বিএনপিবিএনপির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে একাধিকবার সাধারণ নাগরিকদের জনজীবন স্তব্ধ করে দেয়ার হুমকি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনীকে হুমকি ও টানা সহিংসতার বার্তা প্রচার করা হলেও এ বিষয়ে ফেসবুক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এমনকি দলটি সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের জন্য ‘২৫ মার্চ’ ফিরিয়ে আনার কথা ঘোষণার মাধ্যমে যে হত্যার হুমকি প্রদান করেছে, সে বিষয়েও ফেসবুক কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি এখন পর্যন্ত।

এনডিআই এর সমীক্ষায়ও ফেসবুকের এমন পক্ষপাতমূলক আচরণ বেশ স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। এনডিআই এর প্রতিবেদন অনুসারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সর্বাধিক পরিমাণে অপপ্রচারের শিকার হন। কিন্তু বিগত কয়েক বছরের ফেসবুক প্রতিবেদনে এ বিষয়ক কোন বার্তা পাওয়া যায়নি। স্পষ্টতই বোঝা যায় মেটা ও তার নিজস্ব তদন্ত ব্যবস্থা পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণেই এ বিষয়ে কোন তথ্য মেটার প্রতিবেদনে স্থান করে নিতে পারেনি। আর এখানেই ফেসবুক কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা। কেনান প্রতিটি দেশে নির্দিষ্ট একটি সূত্রের ওপর অধিক নির্ভরশীলতার কারণে ঐ সূত্রটির পক্ষপাত আচরণ সরাসরি প্রভাবিত করে দেশটির সকল ফেসবুক ব্যবহারকারীকে।

এ ছাড়াও যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান করে হুমকি প্রদান সহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উস্কানি ছড়িয়ে দেয়ার একাধিক কার্যক্রমের শুরু ফেসবুক থেকে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিবেদন অনুসারে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার একাধিক কার্যক্রম শুরু হয় ফেসবুক থেকে। শুধু তাই নয়, ফেসবুক ব্যবহার করে এখনও সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প প্রচারিত হচ্ছে বিভিন্ন পেজ থেকে। এ বিষয়েও একেবারেই নীরব ফেসবুক।

EU-Metaফেসবুকের এ ধরণের পক্ষপাতমূলক কার্যক্রম বা প্রভাববলয় থেকে নিজ দেশের নাগরিকদের রক্ষা করতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ভুক্ত দেশগুলো এই জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের ওপর বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সেই সঙ্গে ইইউ এর নিজস্ব আইন মেনে ফেসবুক চলতে বাধ্য বলে জানানো হয়, অন্যথায় মেটার সকল কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ার হুমকি প্রদান করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একই দাবি উত্থাপন করা হলে বিষয়টিকে ‘বাকস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ’ বলে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়।

বাংলাদেশে পাকিস্তানের শোষক গোষ্ঠীর চালানো গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যা নিয়ে ছবি প্রকাশিত করা হলেও ফেসবুক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। যেমন বর্তমানে ফিলিস্তিনে ইসরাইলের গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে লেখা, ভিডিও বা ছবি প্রকাশিত করলে তা ডিলিট করে দেয়া হয় ফেসবুক থেকে। শুধু পোস্টগুলো ডিলেট করেই সীমাবদ্ধ থাকে না ফেসবুক অনেক সময় পেজ বা অ্যাকাউন্ট নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা সারা জীবনের জন্য ব্লক করে দেয় ফেসবুক। নিজেদের এমন কার্যক্রমের জন্য ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও কোন ব্যাখ্যা মেলে না ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাজ থেকে। বিষয়টিকে অনেকেই ফেসবুকের স্বেচ্ছাচারিতামূলক আচরণ হিসেবেই দেখেন।

আরও পড়ুন : নিরীহ মুসলিম ফিলিস্তিনিদের গণহত্যায় সমর্থন দিচ্ছেন মির্জা ফখরুল ও তার দল বিএনপি!

২০১৩ সাল থেকেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াত ও তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলোর গুজব, মিথ্যা তথ্য প্রচার ও বিভ্রান্তিকর বার্তা প্রেরণের একাধিক ঘটনা ঘটলেও প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে এভাবে প্রতিবেদন প্রদান করলো মেটা। এর কারণ হিসেবে মূলত বাংলাদেশের সরকারের ইসরাইল বিরোধী অবস্থান ও ফিলিস্তিনের প্রতি পূর্ণ সমর্থনকে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের পাশাপাশি ফিলিস্তিনের গণহত্যার বিরোধিতা করে পোস্ট করছে দেশের অধিকাংশ মানুষ। আর এ কারণেই অনেকের ওপরই নেমে এসেছে ফেসবুকের সাসপেন্ড, ব্যান বা শাস্তির খড়গ। অনেকের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার বন্ধা রাখা হয়েছে প্রায় ৩ দিন থেকে ৩ মাস পর্যন্ত। কারো কারো অ্যাকাউন্ট একেবারেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি ছাত্রলীগ যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে দেশে ফিলিস্তিনের পক্ষে সর্ববৃহৎ শিক্ষার্থী র‍্যালি ও মানববন্ধনের আয়োজন করে।

[বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশেও বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে ব্যর্থ মেটা]

কিন্তু আওয়ামী লীগের বিপরীতে বিএনপিকে দেখা যায় ইসরাইল ফিলিস্তিন ইস্যুতে একেবারেই নিরব ভূমিকায় থাকতে। দলটির পক্ষ থেকে এই হামলা বন্ধ করার জন্য কোন বিবৃতি, সমাবেশ বা আয়োজনও করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে বিএনপি সমালোচনার মুখে পড়লেও নিরব অবস্থানে থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে। আর ঠিক তারপরই মেটার পক্ষ থেকে বিএনপির দুর্নীতি ও নির্বাচন পূর্ববর্তী সহিংসতার বিষয়ে এভাবে প্রতিবেদন দাখিল করলো মেটা। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সরকারে চাপ প্রদান না করলেও মার্কিন প্রতিষ্ঠান মেটার মাধ্যমে চাপ প্রদান করতে একটি পথ তৈরি করা হয়েছে এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে।

আরও পড়ুন :