যুদ্ধাপরাধী

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) যারা সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন, তাদেরকে কেন্দ্র করে গুজব প্রচারের পাশাপাশি হামলারও শিকার হয়েছিলেন তারা। এ কারণে হত্যা করা হয় আরিফ রায়হান দীপ ও তন্ময় আহমেদকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে মৃত ভেবে ফেলে রাখা হয় রাস্তার পাশে। এবার সেই যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে লবিস্ট হিসেবে কাজ করা ব্যক্তিদের কেন্দ্র করে গড়া প্লাটফর্ম থেকে আবারও গুজবের শিকার হচ্ছেন তন্ময় আহমেদ সহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সক্রিয়রা।

বাংলাদেশের কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী জামাতে ইসলামের নেতা মীর কাসেমের হয়ে আইনি লড়াই করা এক ব্রিটিশ অ্যাডভোকেটের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। ফেসবুকে সোচ্চার নামের এই পেজটি পরিচালিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন মাইকেল পোলাক নামের এক ব্যক্তি। যুদ্ধাপরাধের বিচার ভণ্ডুল করতে আন্তর্জাতিক সহায়তা আদায়ের জন্য এই ব্যক্তিকে লাখ লাখ ডলার খরচ করে লবিস্ট হিসেবে নিয়োগ করেছিলো মীর কাসেমের পরিবার।

এদিকে শিবির হামলায় গুরুতর আহত তন্ময় আহমেদ ও হেফাজত সমর্থক হিসেবে পরিচিত মেজবাহর হামলায় নিহত আরিফ রায়হান দীপকে নিয়ে কোন প্রতিবেদন প্রকাশ না করা সোচ্চার তাদের গুজব নির্ভর বক্তব্যের প্রমাণ হিসেবে আবারও গুজবের আশ্রয় নিয়েছে। নিজেদের প্রথম পোস্টে ও ওয়েব সাইটে দেওয়া তথ্যে সোচ্চার জানায়, ‘নির্যাতনে তাদের (নির্যাতনকারীদের) সুনির্দিষ্ট ভূমিকা এনামুলের জবানবন্দী ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে যাচাই করা হয় নি এবং অভিযুক্তদের মন্তব্য নেওয়ার জন্য সোচ্চারের পক্ষ থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করা হয় নি।‘ কিন্তু নতুন পোস্টে তারা শিক্ষক সমিতির নাম ব্যবহার করে একটি সভার কার্য বিবরণীর ছবি প্রকাশ করেন এবং দাবি করেন তাদের বক্তব্য সত্য। যদিও এখানেও কার ওপর হামলা হয়েছে বা কারা হামলা করেছে এমন কোন তথ্যই প্রদান করা হয়নি।

আরও পড়ুন : আবরার হত্যাকে পুঁজি করে মাঠে নেমেছে জামাত-শিবির

উল্টো যেই ব্যক্তির বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এই নির্যাতনের বর্ণনা দেয়া হচ্ছে তার পোস্টে বেশ স্পষ্টভাবেই উল্লেখ আছে যে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে ছিলেন তিনি। সোচ্চারে প্রকাশ হওয়া এনামুলের বক্তব্যে রয়েছে, ‘আওয়ামীলীগ সরকার যখন মানবতাবিরোধী আপরাধ ট্রাইবুনালের নামে বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের প্রহসনের বিচার শুরু করে, তখন তার অসঙ্গতি নিয়েও লেখালেখি করি ফেসবুকে।’

একটি মানবাধিকার ভিত্তিক সংগঠন হিসেবে দাবি করা প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক ও ওয়েব সাইটে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে এ ধরণের বক্তব্য বেশ স্পষ্ট বার্তা দেয়, পোলাক ও টবি ক্যাডম্যান যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য যেই কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলেন লবিস্ট হিসেবে তার একটি অংশ ‘সোচ্চার’।

১৯৭১ সালে কাসেম জামায়াতের তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ওই সময় চট্টগ্রামে তাঁর একটি টর্চার সেল ছিল। ১৯৭৭ সালে ছাত্র সংগঠনটি ইসলামী ছাত্রশিবির হিসাবে পুনরায় আত্মপ্রকাশ করলে কাসেম এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন।

মানবাধিকার কর্মীরা ওই পেজটির কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই পেজ থেকে তন্ময় আহমেদসহ বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে শিবিরের কর্মীদের হামলার শিকার হন তন্ময়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাবিষয়ক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আইএইচএস জেনের গ্লোবাল টেররিজম অ্যান্ড ইনসারজেন্সি অ্যাটাক সূচক ২০১৩তে শিবিরকে বিশ্বের তৃতীয় সশস্ত্র গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

এদিকে সোচ্চারের পেজ থেকে দুটি পোস্ট সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। ওই পোস্টগুলোর সঙ্গে বুয়েট শিক্ষার্থীদের উগ্রবাদী সংগঠন হিজবুত তাহরীরের ইমেইলের মিল রয়েছে। ওই পোস্টে বুয়েট শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে ক্রুসেডে যোগ দিতে আহ্বান জানানো হয়। একই ধরনের পোস্ট করা হচ্ছে জামাতের ছাত্র সংগঠন শিবিরের ফেসবুক পেজ বাঁশের কেল্লা থেকেও। এবং সমস্ত পশ্চিমা মূল্যবোধ পরিত্যাগ করে৷ জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবির এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মুখপত্র বাঁশেরকেল্লাতেও বুয়েট নিয়ে হিজবুতের সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

এই পোস্টের ত্রুটিগুলো নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন আওয়ামী লীগের ওয়েব টিবের সমন্বয় তন্ময়। ওই পোস্টে তিনি বলেন, কীভাবে একজন শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার হল থেকে বের করে আনা যায়। তাও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে কোনো মিডিয়া রিপোর্ট ছাড়াই। আমার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকা সাবেক শিবির নেতার বিবরণের ভিত্তিতে এই মিথ্যা অভিযোগগুলো করা হয়েছে।

বুয়েটের আরেক শিক্ষার্থী দীপের ওপর হামলার আগেও এমন মিথ্যাচার হয়েছিল বলে ওই পোস্টে জানান তন্ময়। তিনি বলেন, আক্রমণের আগে, বাঁশেরকেল্লা সহ শিবিরের সাথে সম্পৃক্ত পেজগুলো আমাদেরকে ইসলামের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে মিথ্যাচার করেছিল।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুয়েটে থাকাকালীন তন্ময় শিবিরের একটি নেটওয়ার্ক ফাঁস করে যা সাধারণ ছাত্রদের শোষণ করার জন্য গোপনে কাজ করছিল।

২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলাকালে জামাত শিবির ও এর সমর্থকরা বিচার কাজ থামাতে দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক হামলা ও আগুন সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটায়। ওই সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে থাকা বুয়েটের ছাত্রলীগের ২ নেতার ওপর হামলা চালানো হয়। এরমধ্যে একজন পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মানবাধিকার কর্মী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রঞ্জন কর্মকার বলেন, এই ধরনের দাবি করে তারা ইচ্ছা করে গুজব ছড়াতে চাইছে। এর মাধ্যমে তারা জামাতের ছাত্র সংগঠনের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইছে। এই পেজের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে এই মানবাধিকার কর্মী বলেন, তাদের দাবির কোন সত্যতা নেই। বুয়েট শিক্ষার্থীদের উপর দুটি ভয়ঙ্কর হামলার বিষয়টি সেখানে নেই।

ওই পেজের উদ্বোধনে পোলাকের উপস্থিতি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন এই মানবাধিকার কর্মী। তিনি বলেন, জামায়াতের সম্পৃক্ততা না থাকলে পোলাক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন না। পোলক যুদ্ধাপরাধীদের দায়মুক্তির পক্ষে ছিলেন। ওই সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে নস্যাৎ করতে বিশ্বে যে কয়জন কাজ করেছেন তাঁর মধ্যে একজন পলক।

বুয়েটের সাবেক ছাত্র যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন তাদের নিয়ে কুৎসা ছড়াতে তৈরি এই পেজে জামায়াতের যোগসাজশ স্পষ্ট।

[যুদ্ধাপরাধী পরিবার সংশ্লিষ্ট এফবি পেজ থেকে সাবেক বুয়েটিয়ানদের নিয়ে অপপ্রচার, মানবাধিকার কর্মীদের নিন্দা]

জামায়াতের হয়ে লড়াই করা আইনজীবী টবি ক্যাডম্যানের সাথে যোগসাজশ করে পোলাককে যুদ্ধাপরাধকে ক্ষুণ্ন করে যৌথ বিবৃতি দিতেও দেখা গেছে। তারা তাদের মক্কেলদের ভুক্তভোগী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তবে প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধপরাধীদের জন্য গঠিত আদালতের রায়কে ঐতিহাসিক হিসেবে আখ্যা দিয়েছে লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনারা।

আরও পড়ুন :