সাংবাদিক

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) সাংবাদিক সমিতির কার্যনির্বাহী পরিষদ বিলুপ্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ রয়েছে, বুয়েট ক্যাম্পাসে উগ্রবাদ ও অপপ্রচার চালানো হতো এই সমিতির পক্ষ থেকেই। টাঙ্গুয়ার হাওরে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এই সংগঠনটির সেক্রেটারিসহ ছয়জন এফআইআরভুক্ত আসামি। তবে বুয়েটে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য দায়ী এই সাংবাদিক সমিতির কমিটি বিলুপ্ত করলেও ওই ছয় শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বুয়েট কর্তৃপক্ষ।

ছাত্র রাজনীতি নিয়ে গত মাসের শেষের দিকে বুয়েটে একটি গোষ্ঠী পরীক্ষা বর্জনের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের উস্কানি প্রদান করে। গত ২৮ মার্চ ছাত্রলীগের সভাপতি বুয়েটে প্রবেশ করে ছাত্রলীগের কমিটি দিচ্ছে এমন গুজব ছড়িয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়। এ সময় ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে এক শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার ও তার সঙ্গে থাকা অন্যান্য শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করে বহিষ্কারের দাবি জানানো হয়। সেইসঙ্গে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ বহালের দাবিও জানানো হয়। শেষমেশ আন্দোলনের বিষয়টি গড়ায় হাইকোর্ট পর্যন্ত। যেখানে উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে বলা হয়, বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি চলতে বাধা নেই।

এমন পরিস্থিতিতে ঈদের ছুটির আগেই বুয়েট প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপাচার্য সত্য প্রসাদ মজুমদার আদালতের রায়ের পর আইনি লড়াইয়ে যাবার ঘোষণা দেন। এরপরেও ঈদের পর বুয়েট ক্যাম্পাস খোলার পর কিছু শিক্ষার্থী পরীক্ষা বর্জনের ডাক দেন।

বুয়েট সাংবাদিক সমিতির সঙ্গে জড়িত ছাত্রসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে উদ্বেগজনক নানা তথ্য। জানা গেল, এ সমিতির সদস্য হিসেবে আছেন হাওরে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় আটক ও মামলার আসামি (এখন জামিনে আছেন) অন্তত ছয় ছাত্র। আটকের সময় যাদের শিবির সংশ্লিষ্টতার কথা সুনামগঞ্জ জেলা জামায়াত নেতারাও গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন। এমনকি তাদের আদালতে আনা হলে সেখানে জামায়াত-শিবিরের পক্ষ থেকে তাদের আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। এই সমিতির সাথে যুক্ত ছয়জন হাওরের ঘটনায় মামলার আসামি। তারা হলেন মো. ফাহাদুল ইসলাম, খালিদ আম্মার, তানভীর আরাফাত ফাহিম, মাইনুদ্দিন, মো. মাহমুদুল হাসান ও মো. সাইদ আদনান অপি। আর এ সাংবাদিক সমিতির কেউই সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত নয়।

বুয়েটের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যেই এ ধরনের সমিতি পরিচালনা নিয়ে আছে ব্যাপক মতবিরোধ। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা নিজেরা গড়ে তোলেন সমিতি। বিরোধের কারণে কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিক সমিতিও আছে। রয়েছে অফিস। সাধারণত কিছু বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিনিধি দিয়ে থাকে গণমাধ্যমগুলো। তাদের কাজ হচ্ছে যার যার প্রতিষ্ঠানের খবর অফিসে পাঠানো। যেমন জেলা-উপজেলা প্রতিনিধিরা নিজ নিজ অফিসের জন্য কাজ করেন। সাংবাদিক সমিতি বললে এমনটাই সবাই বুঝে থাকেন।

কিন্তু বুয়েটের পাশেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থাকার কারণে এখানকার গণমাধ্যমগুলোর প্রতিনিধি দেওয়ার আগ্রহ দেখানো হয়। মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিরাই বুয়েটের নিউজ সংগ্রহ করে থাকেন। কিন্তু এখানেও যে একটা অদ্ভুত সাংবাদিক সমিতি আছে তা এবার আন্দোলনের সময় সামনে আসে। কেননা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং গুজব প্রচার করে এই সমিতি থেকেই আন্দোলনের জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদেরকে উস্কে দেওয়া হয়।

বুয়েটে নিহত আবরার ফাহাদের ভাই আবরার ফাইয়াজের দেওয়া ছাত্রলীগের কমিটি প্রদানের গুজব পোস্ট ঠিকই প্রচার করা হয় বুয়েট সাংবাদিক সমিতির পেজ থেকে। এদিকে লাগাতার গুজব ছড়িয়ে বুয়েটকে অস্থিতিশীল করার ঘটনায় বুয়েটিয়ানদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।

আরও পড়ুন : আবরার হত্যাকে পুঁজি করে মাঠে নেমেছে জামাত-শিবির

যদিও বুয়েট সাংবাদিক সমিতি যে কেবল ফাইয়াজের গুজবই প্রচার করেছে তা নয়। এটির আন্দোলনকারীরা ব্যবহার করছেন উস্কানিমূলক নানা তথ্য ছড়ানোর কাজে। যেখানে পড়ালেখা ও কো-কারিকুলাম নিয়ে কোন কথা নেই বললেই চলে।

২০১৯ সালে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হলেও সেখানে কার্যক্রম চালিয়ে গেছে জামায়াতে ইসলামের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির ও হিজবুত তাহরীর। পরীক্ষা বর্জনকারীদের পক্ষ থেকে শুরুর দিকে বুয়েটে জামায়াতে ইসলামির ছাত্র সংগঠন শিবির ও নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরীরের কার্যক্রম নিয়ে কোনো আপত্তির কথা জানানো হয়নি। পরে গণমাধ্যমের চাপে পড়ে তারা এই বিষয়টিও নিয়ে মুখ খুলতে বাধ্য হয়। তবে তাদের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দুই সংগঠনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তেমন তৎপরতা চোখে পড়েনি।

[বুয়েট সাংবাদিক সমিতির সেক্রেটারিসহ ৬ জন টাঙ্গুয়ার হাওরের এফআইআর ভুক্ত আসামী, কমিটি বিলুপ্ত]

এরইমধ্যে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের ইমেইল দিয়েছে নিষিদ্ধ উগ্রবাদী জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীর। শিক্ষার্থীদের মেইলে একাধিকবার উগ্রবাদী বার্তা ও রাজনীতি বন্ধের বার্তা দিয়ে মেইল করার পর এবার নিজেদের ফেসবুক পেজের একটি ভিডিওর কিউআর কোড স্টিকার আকারে ছাপিয়ে পলাশীর মোড় থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিচ্ছে উগ্রবাদী গোষ্ঠীটি।

আরও পড়ুন :