পরীক্ষা বর্জন

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখতে চাইছে উগ্রবাদী ছাত্রসংগঠন শিবির। দেশের শীর্ষ পাবলিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি এবং একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত করার জন্য ইসলামী ছাত্র শিবিরসহ চরমপন্থী সংগঠনগুলো নতুন পাঁয়তারা শুরু করেছে।

বুয়েটের বর্তমান এবং সাবেক ৫০ জন শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি নেটওয়ার্ক মূলত সরাসরি মিথ্যা ছড়ানোর জন্য ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছে। অভিযোগ উঠেছে, এতে তারা নির্যাতনের মিথ্যা বর্ণনা, বিভিন্ন ছাত্র সংস্থার নামে অযৌক্তিক গল্প ব্যবহার করছে। অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমকে হুমকির মুখে ফেলতে তারা বিভিন্ন প্ররোচনাও দিচ্ছে। বুয়েটে এক উগ্রবাদী শিক্ষার্থীর হাতে আরেক শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনাতেও তারা উগ্রবাদের পক্ষ নিচ্ছে। পাশাপাশি এই উগ্রগোষ্ঠীগুলো উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করার জন্য প্ররোচিত করছে।

এমন সব অপপ্রচারের কারণেই বুয়েটের কিছু শিক্ষার্থী পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। এতে প্রতিষ্ঠানটিতে সেশন জটের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমনটি হলে বুয়েটের হাজার হাজার ছাত্রদের জন্য আরও সমস্যা তৈরি হবে।

পুরো মার্চ জুড়ে বুয়েটের শিক্ষার্থীদের ইমেইল করেছে জঙ্গিগোষ্ঠী হিজবুত তাহরীর। এর সঙ্গে শিবির বাঁশেরকেল্লা পেজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উগ্রবাদী বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

বুয়েটে ছাত্ররাজনীতিবিরোধী প্রচারণায় আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো হিজবুত ও শিবিরের হুমকি বড় করে দেখা হচ্ছে না। শিবিরের সাবেক ও বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতারা বার বার বুয়েটে তাদের কার্যক্রমের কথা বললেও ওই নেটওয়ার্কের সদস্যরা সেগুলো নিয়ে কথা বলছে না। তারা পেছনে থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উস্কানিমূলক তথ্য দিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে টাঙ্গুয়ার হাওরে শিবির সংশ্লিষ্ট থেকে রাষ্ট্রদ্রোহী কার্যক্রমে অংশগ্রহণের অপরাধে ২০২৩ সালে গ্রেফতার হওয়া শিক্ষার্থীদের দোষ ঢাকতে ছাত্র রাজনীতির বিষয়টি তুলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বুয়েটিয়ান নামের একটি পেজ থেকে যুদ্ধাপরাধীবিরোধিতার জন্য বুয়েট শিক্ষার্থী দীপকে নিয়ে নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আবার এই পেজেই দীপের হত্যাকারীর বিষয়ে কোনো কিছুই বলছে না।

[বুয়েটে পরীক্ষা বর্জনের ডাক দিয়েছে কারা?]

বুয়েট কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক কার্যক্রম চালু বা বন্ধ নিয়ে আদালতের রায়ের প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আইনজীবী নিয়োগ ও তাদের চাওয়ার প্রতিফলন ঘটিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। শিক্ষাবীদরা বলছেন যে, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার সাম্প্রতিক প্রচারণাটি স্পষ্টতই একটি ভ্রান্ত উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে।

হিজবুত তাহরীরও শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠানো ইমেইলে একাডেমিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটানোর আহ্বানও জানিয়েছে।

সম্প্রতি বুয়েটের ২১তম ব্যাচের কিছু শিক্ষার্থী তাদের ব্যাচের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয় পরীক্ষা অংশগ্রহণ করবেন না তারা। অন্যদিকে যেসব শিক্ষার্থীরা শিবির ও হিজবুতের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিল তাদেরকেও হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তারা সাইবার বুলিংয়েরও শিকার হচ্ছে।

বুয়েটের ২০তম ব্যাচের ট্রিপল-ই বিভাগের দুই শিক্ষার্থী মোঃ মাহমুদ আকন (ইইই) ও তানভীরুল ইসলাম সাজিন, জামশেদুল ইসলাম রাহাত (এমই) পরীক্ষা বর্জনের পক্ষে কথা বলছেন। অন্যদিকে আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফায়াজও ২১ ব্যাচের শিক্ষার্থী। তিনিও সরাসরি ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন যা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলছে।

আবরার ফায়াজের ফেসবুকের একটি পোস্টে লেখা হয়, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একটি ইউনিট কমিটি দেয়ার জন্য বুয়েটের মাটি ব্যবহার করেছে। অথচ সংগঠনটির সভাপতি হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হওয়ায় বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছিলেন। আবরার কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর পরিবারের ভাড়া করা আইনজীবীর উপস্থিতিতে একটি ফেসবুক পেজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন। ক্যাম্পাসে নির্যাতন নিয়ে বেশ কিছু ভুয়া একাউন্ট চালানোর সাথে জড়িত রয়েছে পেজটি।

ছাত্রলীগের একদল ছাত্রের নির্যাতনে তার বড় ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনায় বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। এ ঘটনায় দায়ীরা সাজা ভোগ করছে। তবে দীপ ও তন্ময় উভয়ের ওপর হামলাকারীরা এখনও বহাল তবিয়তে আছেন।

২০১৩ সালে জামায়াতের ইন্ধনে হেফাজতে ইসলাম রাজধানীতে যে তাণ্ডব চালায় সেখানে উগ্রবাদীদের পক্ষে নিয়ে প্রাণ হারান বুয়েটের সিএসসি বিভাগের ০৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও আহসানুল্লাহ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রেশাদ। এটিও এখন চাপা পড়ে গেছে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, বুয়েটে রাজনীতি বন্ধের বার্তা দিয়ে শিক্ষার্থীদের মেইল করার পর এবার নিজেদের ফেসবুক পেজের একটি ভিডিওর কিউআর কোড স্টিকার আকারে ছাপিয়ে পলাশীর মোড় থেকে শুরু করে বুয়েটের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দিচ্ছে হিজবুত তাহরীর। তবে যেসব শক্তি বুয়েট শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা থেকে দূরে থাকতে হুমকি দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কোন তৎপরতা এখনও চোখে পড়েনি।

[বুয়েটে পরীক্ষা বর্জনের ডাক দিয়েছে কারা?]

একাডেমিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার জন্য বুয়েট কর্তৃপক্ষের বারবার আহ্বানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শিক্ষাবীদদরা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা থেকে বিরত থাকার মতো একাডেমিক বিরোধী কার্যকলাপে কান না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বুয়েটে ছাত্রলীগের অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে রেকর্ড স্বল্প সময়ের মধ্যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়েছে। ছাত্রলীগ বারবার নৃশংসতার নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু দীপকে হত্যা বা তন্ময়ের ওপর হামলার জন্য উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলির কাছ থেকে কখনও এ বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করা হয়নি এমনকি এই ঘটনাগুলোর নিন্দাও জানানো হয়নি। আর এটাই প্রমাণ করে যে তারা কতটা বিপজ্জনক।

আরও পড়ুনঃ