বুয়েট

সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) শিক্ষক সমিতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দ্রুততম সময় ক্লাস ও পরীক্ষা সহ একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর দাবি জানিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রাজনীতি থাকবে নাকি থাকবে না, এ বিষয়ে আদালতে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এমন এক অবস্থায়ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কিছু শিক্ষার্থীকে বর্তমান শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান করে পোস্ট করতে দেখা যাচ্ছে।

যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আইনি প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের কে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার বিষয় সকল কার্যক্রম গ্রহণের পাশাপাশি একাডেমিক কার্যক্রম চালুর কথা বলছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সমিতি ও অ্যালামনাই‌ পৃথক বিবৃতির মাধ্যমে একাডেমিক কার্যক্রম চালুর বিষয় মত প্রদান করেছে, সেখানে কোন স্বার্থে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও ক্লাস সহ সকল একাডেমিক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখার জন্য পরামর্শ প্রদান করছে একটি পক্ষ?

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্র রাজনীতি বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণের কপি পেতে অপেক্ষা করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। হাতে পেলেই পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শুরু। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া শুরুর আগেই বুয়েটে আবারও পরীক্ষা ও ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন কিছু শিক্ষার্থী। আদালতের সিদ্ধান্তকে নিজেদের পক্ষে নিতেই এই সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছে তারা। বিষয়টিকে নিশ্চিতভাবেই আদালত অবমাননা ও আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন হিসেবে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও ক্লাস বর্জনের জন্য উৎসাহিত করছে কারা? তাদের উদ্দেশ্য কী?

বুয়েটে ছাত্র রাজনীতির ক্ষেত্রে বাধা না থাকার পর্যবেক্ষন আদালত থেকে প্রদান করার পরও এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টিতে কমিটি প্রদান করেনি কোন ছাত্র সংগঠন। এ বিষয়ে একাধিক ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা আইনি প্রক্রিয়ার পূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষমান।

কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করতে নারাজ বুয়েটের কিছু শিক্ষার্থী। এ বিষয়ে নিজেদের ব্যাচের প্রতিনিধি হয়ে তারা জানিয়েছেন ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা। বুয়েটের ২০তম ব্যাচের পক্ষ থেকে বলা হয়, যতদিন পর্যন্ত প্রশাসনের সহায়তায় সুষ্ঠু আইনী প্রক্রিয়ার প্রয়োগে বুয়েট ক্যাম্পাসে সকল প্রকার লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের বিজ্ঞপ্তি পুনর্বহাল হচ্ছে না, বুয়েট’২০ ব্যাচ কোন ধরনের একাডেমিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে চাচ্ছে না। এটি ২-৩ মাস থেকে আরও বেশি সময় লাগতে পারে। এই দীর্ঘ সময় ধরেই কী তাহলে বুয়েটে ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকবে?

এদিকে ২১তম ব্যাচ তাদের দাবিতে জানান, যেকোন জঙ্গি সংগঠনের/ নিষিদ্ধ সংগঠনের নামে মেইল/ চিঠি বা অন্য কোনভাবে ছাত্র ও শিক্ষকদের ফাঁসানোর চেষ্টা ঠেকাতে সচেষ্ট হতে হবে, প্রয়োজনে সাপোর্ট সেল খুলতে হবে।

ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনে বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের উস্কাচ্ছে কারা?

অর্থাৎ স্পষ্টভাবে বুয়েটে হিযবুত তাহরীর ও শিবিরের কার্যক্রমকে সরাসরি অস্বীকার করছেন তারা। এমনকি একজন শিবির নেতা নিজেই বুয়েটে শিবিরের কার্যক্রম চলছে জানাবার পরও বিষয়টি আমলে নিতে চাচ্ছেন না এই কতিপয় শিক্ষার্থী। প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি মৌলবাদী এই গোষ্ঠি যেনো অবাধে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত করতে পারে, তার স্বপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে বুয়েটের ২১তম ব্যাচ?

‘আদালতের সিদ্ধান্ত ও আইন প্রক্রিয় না মেনে পরীক্ষা ও ক্লাস বর্জনের ঘোষণা কেনো’ এ বিষয়ে জানতে বুয়েটের ২০তম ব্যাচ থেকে এ কার্যক্রমের পক্ষে থাকা একাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতেই রাজি হয়নি তারা। ফোন করা হয় ২০তম ব্যাচের মিশেল ইসলাম শেলি, মাহমুদ আকন, তানভীরুল ইসলাম, ইলিয়াস কায়কোবাদ ভূইয়া, আব্দুর রহমান, গাজিব আঞ্জুম তালুকদার, জামশেদুল ইসলাম রাহাত আতাহার শিহাব এবং আল ফারাবিকে। ম্যাটেরিয়াল ও ম্যাটালারজিক্যাল বিভাগের ২০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মিশেল ইসলাম শেলি বলেন, বুয়েটের আন্দোলন নিয়ে যা আপডেট আছে সবই সাংবাদিক সমিতির পেজ থেকে জানানো হয়। এর বাহিরে আর কোন আপডেট নেই। আপনাদের যা জানার ওখান থেকে জেনে নিন।

উল্লেখ্য, এই সাংবাদিক সমিতিতে টাঙ্গুয়ার হাওরে আটক হওয়া ৩৪ জন্য শিবির নেতাকর্মীদের মধ্য হতে ৫ জন রয়েছেন। যাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা জোরদার করার কোন দাবি এই দুই ব্যাচের দাবিগুলোর মধ্যে ছিলো না। এমনকি এদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও কোন কথা বলা হয়নি। উল্টো বলা হয়েছে, তাদের বিচার কার্যক্রম আদালত যেই সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা অনুসারে গ্রহণ করা হবে। বিষয়টিকে স্পষ্টরূপে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনকারীদের পক্ষে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীদের দ্বিচারিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেননা ছাত্র রাজনীতি বন্ধের জন্য আদালত ও প্রশাসনকে চাপে ফেলতে পরীক্ষা বর্জনের কথা বলা হলেও মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক কার্যক্রম বন্ধের বিষয়ে কোন চাপ দেয়াতে আগ্রহী নন এই শিক্ষার্থীরা।

অন্যদিকে বুয়েটের বিভিন্ন গ্রুপে সাবেক কিছু শিক্ষার্থী উস্কানিমূলক, বিভ্রান্তিকর ও গুজব ছড়িয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনমত গঠনের চেষ্টা করছেন। সেখানে পরীক্ষার হল থেকে এক শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হলেও এ বিষয়ে কোন তথ্য-প্রমাণ, প্রকাশিত সংবাদ বা তার ক্লাসের সহপাঠিদের বক্তব্যও উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয় সেই অভিযোগকারী। উল্টো জানা যায়, এনামুল নামের সেই অভিযোগকারী নিজে শিবিরের সক্রিয় রাজনীতি করতেন। কিন্তু তার সেই বক্তব্যটি বিভিন্ন গ্রুপে শেয়ার করা হচ্ছে বিশেষ কিছু ব্যক্তির মাধ্যমে।

বিশেষত বুয়েটের আড়িপাতা গ্রুপ এমন একাধিক পোস্ট পাওয়া গেছে যেখানে মৌলবাদীদের হামলায় নিহত আরিফ রায়হান দীপকে নিয়েও মিথ্যা ও গুজব ছড়িয়ে তার চরিত্রহরণের চেষ্টা করা হয়। এ বিষয়টিকে ছাত্র শিবিরের ‘নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন সাবেক অনেক বুয়েটিয়ান।

বিভিন্ন গ্রুপে গুজব ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে শিক্ষার্থীদের উস্কানি প্রদান

এদিকে বুয়েটের ২০ ও ২১তম ব্যাচের কিছু শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষা বর্জনের পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানায়, একই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়টির দুই জন শিক্ষকের কলাম ও সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। যেখানে সকল বক্তব্য ছিলো বেশ কাছাকাছি। একটি কলামে বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক আশিকুর রহমান ছাত্র রাজনীতি থাকাকালিন সময়কে বুয়েটের ‘অন্ধকার অধ্যায়’ বলে অভিহীত করেন। তার লেখায় শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও ক্লাস বর্জনকে আরও উৎসাহিত করা হচ্ছে। আদালতের বিরুদ্ধে গিয়ে একজন শিক্ষক কিভাবে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা-ক্লাস বর্জন করতে উৎসাহিত করতে পারে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।

সেই সঙ্গে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কার্যক্রমকে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এই শিক্ষকের ম্যাকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের। এদিকে কলামের বিষয়ে জানতে অধ্যাপক আশিকুর রহমানকে ফোন দেয়া হলে তিনি কোন প্রশ্ন শুনতে রাজি নন বলে জানান। তিনি বলেন, যা আছে কলামে আছে। আমি কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত নই।

অনেক শিক্ষাবীদ মনে করছেন, আইনি প্রক্রিয়ায় না গিয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময়ের জন্য একাডেমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কতদিন ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে তারা চলবে, সে বিষয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঠিকভাবে অবগত নয় বলেও মনে করেন তারা। এ বিষয়ে আরও চিন্তা করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করছেন তারা।

আরও পড়ুনঃ