ভারত

বারবার ভারতের দ্বারস্থ হয়েছে বিএনপি,পাত্তা না পেয়ে বারবার ভারত বিরোধিতা

বিদেশি শক্তির ওপর ভর করেও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ভণ্ডল করতে ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি। জনগণের ভোটে আওয়ামী লীগ সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও নিজেদের দোষ ঢাকতে বিএনপি দাবি করেছে, নির্বাচনে সরকারের পক্ষ নিয়ে ভারত। আর এমন দাবি তুলে ভারত বয়কট আন্দোলনের ডাক দিয়েছে দলটি । তবে অতীত ঘেঁটে দেখা গেছে বিএনপি বরাবরই নিজেদের সুবিধার জন্য ভারতের দ্বারস্থ হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারও ভারত বয়কট ডাক দিয়ে বিএনপি ভারতকে নিজেদের জন্য কাজ করানোর চেষ্টা করছে।

অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ভারতে দুটি রাষ্ট্রীয় সফর করেছিলেন। জিয়াউর রহমানের আমলে ঢাকায় ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মুচকুন্দ দুবে জানান, ১৯৮০তে তার দিল্লি সফরের পর বাংলাদেশ ভারতকে প্রাকৃতিক গ্যাস বেচতেও রাজি হয়ে গিয়েছিল – শুধু বাকি ছিল দাম নিয়ে রফা।

জিয়াউর রহমান ভারতকে গ্যাস বেচতেও রাজি হয়ে গিয়েছিলেন, বলছেন একজন ভারতীয় কূটনীতিক

একাধিক সূত্র জানায়, ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে আমেরিকান কোম্পানি বাংলাদেশের গ্যাস বিক্রি করতে চেয়েছিল ভারতের কাছে। ভারতের কাছে গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়েছিল খালেদা জিয়া। আর এর মাধ্যমেই বিএনপি ক্ষমতায় আসে। দিয়েই তো ক্ষমতায় এসেছিল। পরে সংসদে এই বিল উত্থাপিত হয়। কিন্তু চারদলীয় জোটের অন্তঃকোন্দলে শেষ পর্যন্ত বিলটি পাস হয়নি।

এবারের দ্বাদশ নির্বাচনের আগেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর বের হয় চিকিৎসার অজুহাতের কথা বলে ভারতে যাচ্ছেন বলে বিএনপির একাধিক নেতা। এদের মধ্যে ছিল দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান এবং কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টু ও তার ছেলে তাবিথ আউয়াল। এছাড়া নির্বাচনের আগে প্রকাশ্যে ভারতে গিয়ে চিকিৎসার জন্য ঘুরে আসেন বিএনপি নেতা মেজর হাফিজ ও আলাল।

ওই সময় বিএনপির বিভিন্ন নেতা ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। এ নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল আউয়াল মিন্টু চ্যানেল ২৪কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, এটাতো খারাপ কিছু না। এটাতো ভালো।

বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধূরীও জানান, বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চায় তার দল। ২০১৫ সালে বাংলাদেশে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের সময়তেও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। তিনি মোদিকে পেয়ে বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র অনুপস্থিত।

[বারবার ভারতের দ্বারস্থ হয়েছে বিএনপি, পাত্তা না পেয়ে বারবার ভারত বিরোধিতা]

এর আগে ২০১১ সালেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন খালেদা জিয়া।
২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেও বিএনপির নেতারা জানান তারা ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়তে চান। ওই সময়ও বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধূরী বলেন, যদি কিছু ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকে তাহলে সেগুলো পেছনে ফেলে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

২০১৮ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় অবদান রাখায় ভারতকে ধন্যবাদ দেন খালেদা জিয়া। এছাড়া বিএনপির ভেরিফায়েড ইউটিউব অ্যাকাউন্টেও জিয়াউর রহমানের ভারত সফরের সময় তার সঙ্গে দেশটির নেতাদের সখ্যতার বিষয়টি দেখা যায়।
‘ভারতবিরোধী’ অবস্থান বদলাচ্ছে বিএনপি?

ওই বছরের নির্বাচনের আগেও বাংলাদেশের শীর্ঘ গণমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ভারতবিরোধী’ অবস্থান বদলাচ্ছে বিএনপি?

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপির তিন নেতা স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবীর সম্প্রতি দিল্লি গিয়েছিলেন। বাংলাদেশে ‘প্রকৃত গণতান্ত্রিক আবহ প্রতিষ্ঠায়’ সাহায্য করার আরজি নিয়েই তাঁরা সেখানে যান। বিএনপির নেতাদের এই সফরের পর দলটির অনেক নেতাই বলছেন, এর মাধ্যমে তাঁদের দল ভারতবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসছে।

এবারও ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দিলেও ভারতীয় কূটনীতিকদের নিয়ে ইফতার পার্টি করেছে বিএনপি। বয়কট ডাক দিয়েও ভারত সংশ্লিষ্টতা বয়কট করতে পারেনি দলটি। ইফতার পার্টিতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর থাকলেও, উপস্থিত ছিলেন না দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

 ‘ভারত বয়কট’ ডাক দিয়ে ভারতীয় কূটনীতিকদের নিয়ে বিএনপির ইফতার

ভারত ইস্যুতে বিএনপির অবস্থান কী—নেতাকর্মী থেকে শুরু করে দলের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, তারা পুরো বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না। এমনকি স্থায়ী কমিটির কোনও বৈঠকেও এখন পর্যন্ত ভারত ইস্যুতে কোনও আলোচনাও হয়নি। তাহলে কোন সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি রুহুল কবির রিজভী দিলেন নতুন এক ঘোষণা। তিনি নির্বাচন বর্জনকারী ৬৩টি দলের পক্ষ থেকে ভারতীয় পণ্য বর্জনের পক্ষে সংহতি জানিয়েছেন। যদিও ৬৩টি দলের মধ্যে অন্যতম রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি।

 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন সদস্যও। দলের অন্যতম একজন সদস্য বাংলাট্রিবিউনকে বলেন, ‘কে, কীসের ভিত্তিতে ভারতবিরোধী রাজনীতি করছে, এগুলো আমাদের স্থায়ী কমিটিতে কোনও আলোচনা হয়নি। আমি জানিও না। এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কমেন্ট করা হবে সেনসেটিভ। কিছু বলতে চাই না।’

ভারত ইস্যুতে বিএনপিতে অস্থিরতা, বিভক্ত নেতারা

নির্বাচন বর্জনকারী ৬৩টি দলের মধ্যে রয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। জোটের সমন্বয়ক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘আমি আপনার কাছে প্রথম শুনলাম এ বিষয়টা। বামজোট, সিপিবিসহ আমরা রাজনীতি করছি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বলয়ের বাইরে। বিএনপির সঙ্গে কোনও পয়েন্টেই একমত হওয়ার সুযোগ নাই।’

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের বয়কটের নামে দেশটিকে চাপে ফেলে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায় বিএনপি। আর এ কারণেই একদিকে যেমন দলটি ভারতবিরোধী কথা বলছে। অপর দিকে তারা ভারতের কূটনীতিকদের পার্টিতেও আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনসম্পৃক্ততা না বাড়িয়ে এমন বিদেশিদের দোষ দিয়ে বা তাদের কাঁধে ভর দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার স্পৃহা বিএনপিকে রাজনীতিতে আরও দেউলিয়ে করে দেবে।

আরও পড়ুনঃ