গণতন্ত্র

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূত হিসেবে বাংলাদেশে দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পর পিটার ডি হাস গত ১০ মার্চ বেশ কয়েকটি সংবাদপত্রে উপ-সম্পাদকীয় লেখেন। তার শিরোনাম ছিল গণতন্ত্রের ব্যাপারে গভীরভাবে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। ওই উপ-সম্পাদকীয়তে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পাঠকদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে এবং অন্যত্র গণতন্ত্র-প্রসারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই কথার মানে হলো এই যে, তাদের কার্যকলাপে সবাই বিশ্বাস করে না।

হাস তাঁর উপসম্পাদকীয়তে সুশীল সমাজ, মানবাধিকার এবং গণমাধ্যমের কর্মীদের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন। তিনি তাঁর লেখায় এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা কূটনৈতিক নিয়মের সীমানাকে চ্যালেঞ্জ করে। আসুন এই শব্দগুলি পরীক্ষা করা যাক।

গাজা উপত্যকার বর্তমান পরিস্থিতি উল্লেখ না করে গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে কোনো সমসাময়িক আলোচনা শুরু হতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবং ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় হামলা শুরু করে। এ হামলায় এ পর্যন্ত ৩১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৭০ শতাংশই নারী ও শিশু।

এখন প্রশ্ন হলো, এই দশকের সবচেয়ে বড় মানবাধিকার বিপর্যয় মোকাবেলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কী করেছে? ফিলিস্তিনিরা যখন গণহত্যার শিকার হচ্ছেন তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একমাত্র দেশ হিসাবে একের পর এক গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে বাধা দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা কর্তৃক আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক আদালতের নির্দেশিত প্রাথমিক পদক্ষেপের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি বিরোধী অবস্থান নিয়েছে।

[শ্রদ্ধেয় হাস কী তার গণতন্ত্রের উপদেশ দিয়ে মজা করছেন?]

নাগরিক সমাজের প্রতি রাষ্ট্রদূত হাসের ব্যক্তিগত আবেগ দুর্ভাগ্যবশত মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তা বা মার্কিন সরকারের বুলি বলে মনে হয় না। অন্তত ফিলিস্তিন এবং সেখানকার জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর অবস্থান দেখে এমনটাই মনে হয়।

উদাহরণ স্বরূপ বলা হয়, জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস রিলিফ অ্যান্ড ওয়ার্কস এজেন্সি ফর প্যালেস্টাইন রিফিউজিস ইন দ্য নেয়ার ইস্ট অক্টোবর ২০২৩ সালে গাজার ১০ লাখ বাসিন্দার আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছে, যা ভূখণ্ডটির মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ। গাজায় যুদ্ধে জাতিসংঘের ত্রাণবিষয়ক সংস্থার ১৫০ জন কর্মী নিহত হয়েছেন। গত জানুয়ারিতে ইসরায়েল অভিযোগ তুলে, জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থার ১৩ হাজার কর্মীর মধ্যে ১২ জন কর্মী তাদের দেশে হামলার সঙ্গে জড়িতে। এরপর প্রায় ১২টি দেশ সংস্থাটিতে ত্রাণ পাঠানো বন্ধ করে দেয়।

এখন আশঙ্কা রয়েছে যে ত্রাণের স্থগিতাদেশ স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। এতে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত গাজা এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের নাগরিক জীবন ব্যবস্থাকে বিপন্ন করতে পারে। পাকিস্তানেও লিটমাস টেস্টে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি প্রতিশ্রুতি। পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এবং তার দল পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফ (পিটিআই) ক্ষমতা পালাবদলের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করেছে। ইমরান এখন কারাগারে। তাঁকে বেশ কয়েকটি মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। তার দল সদ্য সমাপ্ত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নির্বাচনে সর্বাধিক আসন এবং ভোটে জয়ী হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতার বাইরে (সংসদে বিতর্কিত অনাস্থা প্রস্তাবের পরে)।

ইমরান খানের দলকে শুধু ক্ষমতাচ্যুতই নয়, ক্ষমতার বাইরে রাখা হয়েছে। ইমরানের গ্রেফতারের পর পিটিআই’র প্রতিবাদ ঠেকাতে তৎকালীন সরকার সব সীমা অতিক্রম করে দলটির হাজার হাজার কর্মীকে গ্রেফতার করে। সে সময় অনেককেই হত্যা করা হয় এবং তাদের নির্বাচনে প্রচারণাতেও বাধা দেওয়া হয়।

[শ্রদ্ধেয় হাস কী তার গণতন্ত্রের উপদেশ দিয়ে মজা করছেন?]

পাকিস্তানে বিতর্কিত নির্বাচনে পিটিআই-এর কর্মীদের দমন-পীড়ন, ইমরানের জেল এবং নির্বাচন নিয়ে ৩১ কংগ্রেস সদস্যের আপত্তির পরেও মার্কিন নীতি কী? কিছু না, এমনকি ভিসানীতিও নয়!

সমসাময়িক বৈশ্বিক সমস্যাগুলির মধ্যে কেবল দুটি দিয়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং সুশীল সমাজ সম্পর্কে রাষ্ট্রদূত হাসের লিখিত কথাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়।

তাৎক্ষণিক যোগাযোগ এবং সামাজিক নেটওয়ার্কের এই যুগে, ২৪ ঘন্টাই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো সক্রিয় থাকে । তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি লঙ্ঘিত বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন এবং বিশ্লেষণ করছে। এই প্রেক্ষাপটে যখন আমি হাসের উপ-সম্পাদকীয় একাধিক সংবাদপত্রে দেখি তখন আমার মাথায় প্রথম যে বিষয়টি এসেছিল তা হলো, ‘কে এই শ্রদ্ধেয় হাস যিনি তার গণতন্ত্রের উপদেশ দিয়ে মজা করছেন?’

আরও পড়ুনঃ