গুজব

নিজেকে ‘গুজব প্রতিরোধের লাইসেন্সধারী’ ঘোষণা করে গুজবের পসরা সাজিয়ে বসেছেন জিল্লুর

নিজেকে ‘গুজব প্রতিরোধের লাইসেন্সধারী’ ঘোষণা করে গুজবের পসরা সাজিয়ে বসেছেন জিল্লুর রহমান। নির্বাচনের তৃতীয় মাসে বর্তমান সরকারকে যখন পশ্চিমাদেশগুলো সহ বিভিন্ন দেশের সরকার শুভেচ্ছা জানাচ্ছে এবং একত্রে কাজ করার অঙ্গিকার প্রদান করছে, তখন আরও একবার মার্কিন ভিসা নীতি ও নিষেধাজ্ঞা সহ ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন পার্লামেন্টের বক্তব্য নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন তিনি। সেই সঙ্গে দেশের গণমাধ্যমগুলোকে ‘পাপেট মিডিয়া’ বলে অ্যাখ্যায়িত করেন তিনি।

সম্প্রতি ফেসবুকে ৮ মিনিটের এক ভিডিও পোস্টে জিল্লুর রহমান বলেন, বিরোধী নেতারা জেল থেকে বেরিয়েছেন, এর পেছনে কোন চাপ থাকতে পারে। পশ্চিমা চাপগুলো অব্যাহত থাকবে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সরকারকে তারা চাপেও রাখবে। সেই সঙ্গে সরকার থেকে তারা যা চায় সে বিষয়গুলো তারা আদায়ও করতে থাকবে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অথবা কয়েক মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র জানাবে যে কতজনকে তারা এই ভিসা নীতির আওতায় এনেছে এবং তারা কোন কোন পেশার, সেটা তারা অবশ্যই জানান দেবেন। শ্রমিক অধিকার ইস্যুতে পাঁচটি দেশ নিয়ে তদন্ত হচ্ছে (যুক্তরাষ্ট্র করছে) যার মধ্যে বাংলাদেশও আছে। এপ্রিল, মে, জুনের মধ্যে এমন অনেক ঘটনা ঘটতে পারে।

কত জনকে ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র? কোন কোন পেশার লোকজন থাকছে এই তালিকায়?

অথচ বাস্তবতা হলো- মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং এ এখন পর্যন্ত ৮-১০ বার জানিয়েছেন, ভিসা নীতি কার ওপর আরোপ করা হচ্ছে এ বিষয়ক কোন তথ্যই তারা প্রকাশ করেন না। এটিও তাদের পররাষ্ট্র নীতির অংশ। কিন্তু তারপরও এই বিষয় নিয়ে বিগত ১ বছর ধরেই কথা বলে যাচ্ছেন জিল্লুর রহমান। তার ডিসেম্বরের ভিডিওতে বলা হয়েছিলো সামনেই আসছে নিষেধাজ্ঞা। জানুয়ারির নির্বাচন কালেও একই কথা বলেছিলেন তিনি। এমনকি নির্বাচনের পরে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেও শ্রমিক বিষয়ক অনিমের জন্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। যার কোনটাই এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হতে দেখা যায়নি। আতঙ্ক সৃষ্টি করার মধ্য বিভিন্ন কথা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে গেলেও তার যেই ভবিষ্যৎবাণীগুলো সত্য হয়নি তা নিয়ে কখনই মন্তব্য করতে দেখা যায়নি তাকে।

এখানে বিষয়টি স্পষ্ট যে কোনো রকম নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়াই জিল্লুর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন, যা শুধুই তাঁর ধারণাবশত। নিজেকে ডিজইনফো ফাইটার হিসেবে পরিচয় দেওয়া জিল্লুরের গুজব ছড়ানোর বিষয়টি নতুন কিছু নয়। ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের টকশোতে ডেকে এনে উদ্দেশ্যমূলক প্রশ্ন করে বিভ্রান্তি করা, কোনো তথ্য ভুল বললেও সেগুলোর পাল্টা জবাব না দিয়ে ভুল তথ্যকে প্রশ্রয় দেওয়া, আবার ওই টকশোর বিভ্রান্তিকর অংশগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চটকদার হেডলাইন দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া- এমন কাজ তিনি আগেও করেছেন। ‘ডিজইনফো ফাইটার’ হিসেবে মার্কিন বেসরকারি সংস্থা ন্যাশনাল এনডৌমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির (এনইডি) ফান্ড পেয়ে থাকেন জিল্লুর রহমান। উপস্থাপক হলেও অনেক সময়ই নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে উপস্থাপন করেন তিনি।

এই নিষেধাজ্ঞা ছাড়াও পরবর্তী এক ভিডিওতে বাংলাদেশের সকল গণমাধ্যমকে ‘পাপেট’ বলে অ্যাখ্যায়িত করেন তিনি। ‘আমি নিজেই বিভিন্ন সময় বলি বাংলাদেশের গণমাধ্যম আসলে পাপেট মিডিয়া’- দেশের সকল গণমাধ্যম সম্পর্কে ঢালাওভাবে তার এই মন্তব্য সকল সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের জন্য একই সঙ্গে অপমানজনক ও হুমকি স্বরূপ হিসেবে মনে করা হচ্ছে। যেখানে দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে ভাবছে এবং সেখানে বারবার যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা অন্যান্য দেশের বক্তব্যকে উপস্থাপনের মাধ্যমে এবং সেখানে নিজের ব্যক্তিগত অভিমতকে ভবিষ্যৎবাণী হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন জিল্লুর রহমান।

‘নির্বাচন কমিশন ৪১.৮ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছে’- এ বিষয়টি উল্লেখ করে জিল্লুর রহমান বলেন, ‘কোথায় অনেক ভোট পড়েছে কোথাও একেবারেই ভোটার উপস্থিতি ছিলো না। এর মাধ্যমে বোঝা যায় কোথাও না কোথাও, কিছু না কিছু হয়েছে।’- যদিও তার এই মন্তব্যের স্বপক্ষে কোন তথ্য প্রমাণ নির্বাচন পরবর্তীকালে প্রকাশ করতে ব্যর্থ হন এই উপস্থাপক। কিন্তু দুই হাতের আঙ্গুল উচিয়ে তিনি বুঝিয়ে দেন ‘নির্বাচন কমিশনের এই তথ্যটে ঘাপলা আছে।’

এ প্রসঙ্গে বিদেশি গণমাধ্যমে কাজ করা সাংবাদিক ও বার্তা সংস্থা ইউএনবির সম্পাদক ফরিদ হোসেন বলেন, ‘তাঁদের কারণে সাংবাদিকতার প্রতি আস্থা কমে যায়। সামগ্রিকভাবে সাংবাদিক সমাজের ওপর এর একটা প্রভাব পড়ে। সেটা যে পক্ষেই হোক কোনো কিছুর পক্ষে যদি আমি অতিকথন করি তাও ক্ষতিকারক। আবার কিছুই ঘটেনি, সেখান থেকে আপনি তিলকে তাল করে সাংবাদিকতা করলেন। এটি ইয়েলো জার্নালিজম হিসেবে পরিচিত তা করলে কিন্তু আরও ক্ষতিকারক। আমাকে যেটা ব্যথিত করে তা হলো বর্তমান সরকারের কিছু কিছু জিনিসতো ব্যর্থতা আছে। এটাতো থাকবেই। এই ছোট একটা জিনিসকে তুলে ধরে বেলুন ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করা; এই ধরনের হলুদ সাংবাদিকতা তারা করছে। এই হলুদ সাংবাদিকতা কিন্তু সবসময় ক্ষতিকারক ছিল। এখনও ছিল ভবিষ্যতেও থাকবে।’

জাতিসংঘ জরুরি শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) ব্যখ্যা অনুযায়ী, একজন ফ্যাক্ট চেকারকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ব্যক্তিগত কথাবার্তা উভয় ক্ষেত্রেই বস্তুনিষ্ঠ এবং নিরপেক্ষ হতে হবে। তবে এ দিক দিয়ে পুরোটাই ভিন্ন রূপে দেখা যায় উপস্থাপক জিল্লুর রহমানকে। এর আগেও নিজের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে আরব বসন্তের সঙ্গে মিল রেখে তিনি বাংলা বসন্তের কথা বলছেন। বিষয়টিকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে থেকে উস্কানি হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র আরব বসন্তের নামে যে মধ্যপ্রাচ্যকে ধ্বংস করেছিল।

দেশবিরোধীরাও এখন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তেমনটি চাইছে। আর এ ক্ষেত্রে বাংলা বসন্ত নাম দেয়ার অর্থ হলো একজন অসচেতন নাগরিক হিসেবে নিজ দেশের ধ্বংসকে স্বাগত জানানো। শুধু আরব বসন্তের কথা বলেই খ্যান্ত হননি জিল্লুর। তিনি বাংলাদেশে মার্কিন হস্তক্ষেপ নিয়েও নিয়মিত তার টকশো এবং ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্টে কথা বলে গেছেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করার মতই কথা বলেছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক চপল বাশার বলেন, অপতথ্য প্রচার করাটাই একটা অপরাধ। সেই অপতথ্য যদি আবার একজন সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে করেন তাহলে সেটা মহাঅপরাধ। ধরুন,একটা ভুল তথ্য প্রচার করে পরে হয়তো মাফ চাইলাম। এতে কি তাদের সম্মানটা কি থাকে? আর এরকম তো হয়েছে। প্রচার করে দিয়েছে তারপর যখন দেখেছে হয় নাই তখন আবার ক্ষমা চেয়েছে। এগুলোতো ঠিক না। এতে মিডিয়ার ক্ষতি হয়। সত্যকে মিথ্যা দিয়ে চাপা রাখা যায় না।

এদিকে জিল্লুর রহমান সিজিএস নামন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে প্রায়ই গোল টেবিল বৈঠকের আলোচনা করেন। এ ধরণের আলোচনায় অংশগ্রহণ করা একাধিক বক্তা গোল টেবিলে তার সঞ্চালনা ও বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করেন। সেই সঙ্গে তারা জানান, প্রায়ই গোল টেবিল বৈঠকে দেয়া বক্তব্যের একটি অংশ কেটে প্রচার করেন জিল্লুর, যা তার সম্পূর্ণ বক্তব্যকে বা সত্যিকার বার্তা প্রদান করে না।

এ ছাড়াও সিজিএস এর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা ইচ্ছা করে পক্ষপাত স্যাম্পলিং এর মাধ্যমে গবেষণা করে তার ফলাফলকে প্রভাবিত করে উপস্থাপন করেছে। এরপর এই ধরণের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোতিত প্রশ্ন তারা করেছে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের। সেখান থেকেই জিল্লুর রহমান তার ইচ্ছাধিন মত কূটনীতিকদের বাছাই করা বক্তব্য বা বক্তব্যের অংশ প্রচার করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

জিল্লুর রহমান তার টকশো তৃতীয় মাত্রা এবং ব্যক্তিগত প্রোফাইলে বিগত কয়েক মাস ধরে যা ভিডিও টাইটেল, ক্যাপশন ও থাম্বনিল শেয়ার করেছেন তাকে মোটা দাগে তিন ভাগে ভাগ করা যায়, এর মধ্যে একটি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য সহ পশ্চিমা দেশগুলো, সরকারের পতন কবে হচ্ছে বা শিগগিরই হচ্ছে, দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই। মজাদার বিষয় হলো একটি দেশের অভ্যন্তরে থেকে সেই দেশের সরকার পতনের দিন তারিখ বারবার জানাচ্ছেন জিল্লুর রহমান। সেই সঙ্গে অপর একটি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের কথা বার বার প্রচার করে যাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে এখনও কোন সমস্যার মুখে পড়েননি তিনি। কিন্তু তারপরও তারই কাছে ‘দেশের গণমাধ্যম স্বাধীন নয়’ কথা শোনা যাচ্ছে।

[এবার গুজব মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে]

বাংলাদেশে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে অতীতে এবং বর্তমানে ফান্ড করে যাচ্ছে মার্কিন সংস্থা এনইডি। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে গণতন্ত্র সুরক্ষায় তাদের মূল কার্যক্রম বলে উল্লেখ করা হয়। সম্প্রতি সময় মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট সহ আরও বেশ কিছু ফোরামের আলোচনায় গণতন্ত্র সুরক্ষায় সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে- গুজব (রিউমার), বিভ্রান্তি এবং ভুল তথ্য (ডিজইনফরমেশন) এবং ভুল বার্তা দেয়া (মিস লিডিং)। একজন ডিজইনফো ফাইটার হিসেবে এ সবগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করা উচিত ছিলো জিল্লুর রহমানের। কিন্তু এনইডি ফান্ডের মাধ্যমে উল্টো বিভ্রান্তিকর ও ভুল তথ্য ছড়াবার পাশাপাশি ‘ক্লিক বেইট’ হিসেবে চটকদার সব শিরোনাম ও থাম্ব দিয়ে ভিডিও শেয়ার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন জিল্লুর। একজন উপস্থাপক হিসেবে ‘ফেব্রুয়ারির মধ্যে কী সরকার পতন হচ্ছে’ এমন প্রশ্ন রাখা কোনভাবেই নিরপেক্ষ অবস্থান নয় বলে মনে করেন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আরও পড়ুনঃ