ইউনূস

ইসরায়েলের হয়ে পক্ষপাতমূলক সংবাদ নীতির কারণে নিজেদের কর্মীদের তোপের মুখে পড়া মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএন চ্যানেলে মেয়ে মনিকা ইউনূসের পর সাক্ষাৎকার প্রদান করলেন খোদ শান্তিত নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। যেই সংবাদমাধ্যমটির পক্ষপাতমূলক পলিসি ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন খোদ প্রতিষ্ঠানটির কর্মী সাংবাদিকরা। ইসরায়েলের হয়ে পক্ষপাতমূলক সংবাদ পরিবেশন করে যাওয়া সেই প্রতিষ্ঠানে সাক্ষাৎকার দিলেন ড. ইউনূস।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শ্রম আইন লঙ্ঘনের দায়ে দণ্ড পাওয়া শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস শাস্তি থেকে রক্ষা পেতে লবিংয়ে নেমেছেন। এজন্য তার কন্যা মনিকা ইউনূস ও তিনি নিজে কাজ করছেন। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এ দেয়া সাক্ষাৎকার সেটিরই অংশ।

ইউনূস এমন এক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছে যা গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের হয়ে পক্ষপাতমূলক খবর প্রকাশ করায় নিজেদের কর্মীদের তোপের মুখে পড়েছে। সংবাদমাধ্যমটির কর্মীরাই এই হীন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে ও সরাসরি প্রতিবাদ জানিয়েছে। সিএননের নিউজরুম থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও অভ্যন্তরীণ একডজন মেমো ও ইমেইল ঘেঁটে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জানায়, আটলান্টার হেডকোয়ার্টার থেকে নির্দেশনা অনুযায়ী মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যমটিতে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ নিয়ে সিএনএনের এক কর্মী গার্ডিয়ানকে বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বেশিরভাগ খবর ইসরায়েলের প্রতি নেটওয়ার্কের পদ্ধতিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতিত্বের দ্বারা প্রভাবিত করা হয়েছে। এটি সাংবাদিকতার অপব্যবহারের সমান।

cnnসংবাদমাধ্যমটিতে হামাসের বক্তব্য এবং অন্যান্য ফিলিস্তিনি দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে। পক্ষপাতমূলক এই সংবাদমাধ্যমটিতে সাক্ষাৎকার দেন শ্রম আইন লঙ্ঘনের দায়ে দণ্ড পাওয়া শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

এদিকে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে চলা আইনি প্রক্রিয়া বন্ধ করতে নানাভাবে চলছে আন্তর্জাতিক লবিং। তাকে ‘আইনি হয়রানি’ বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টে বিজ্ঞাপন হিসেবে একটি যৌথ বিবৃতি ছাপা হয়েছে, যে বিবৃতি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ১২ জন সিনেটর। এর আগে বিচার বন্ধে এমনই বিজ্ঞাপন আকারে বিবৃতি দিয়েছেন কয়েকজন নোবেলজয়ী। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে ইউনূসের পরিচিত আছে। আর এসব লবিং, বিবৃতি ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিচার বন্ধের আহ্বানকে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর চাপ প্রয়োগ ও হস্তক্ষেপের সামিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন : “গোপন তথ্য ফাঁস” হিলারির তদবিরেই ইউনূস নোবেল পান

তবে সবচাইতে মজার বিষয় হলো ড. ইউনূসের পক্ষে বিবৃতি দেয়ার জন্য বারবার এই ব্যক্তিদের দেখা গেলেও গাজায় ফিলিস্তিনদের ওপর চলা ইসরাইলের গণহত্যা বন্ধে এখন পর্যন্ত কোন কথাই বলেননি এই বিবৃতি দানকারী অধিকাংশ সদস্য। এমনকি এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানিয়ে কোন বিবৃতি প্রদান করেননি তারা। তবে কি গাজায় ইসরাইলের গণহত্যার থেকেও বাংলাদেশে ড. ইউনূসের মামলাকে বড় মানবাধিকার ইস্যু হিসেবে দেখছেন তারা?

সিএনএনের সাংবাদিক ক্রিস্টিন আমানপোরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ড. ইউনূস তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তার দাবি, মূলত হয়রানি করতেই তাকে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে। এই মামলা দেওয়ানি আদালতেই নিষ্পত্তি সম্ভব। কিন্তু এগুলোকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অর্থহীন। তিনি ও তার সহকর্মীরা শতভাগ নির্দোষ। আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞরাও বিষয়টি যাচাই করেছেন। তারাও বলেছেন, এই অভিযোগগুলো ‘ভিত্তিহীন’।

আমানপোরের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন মারাত্মক সব ঘটনা ঘটছে। আমাকে ইতিমধ্যেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

আরও পড়ুন : ইউনূসের অবতারণা কি গাজায় ইসরাইলের গণহত্যাকে সমর্থনকারী বান্ধবী হিলারিকে বাঁচাতেই?

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউনূস যে কথাটা বলতে চাচ্ছেন, তাতে পরোক্ষভাবে উনি স্বীকার করেই নিয়েছেন যে, এখানে শ্রম আইন লঙ্ঘন হয়েছে। শ্রম আইন ২০০৬ ও বিধিমালা ২০১৫ আইএলও কর্তৃক স্বীকৃত এবং সেখানে ফৌজদারি একটা আলাদা চ্যাপ্টার আছে।

সুতরাং এ থেকে বিষয়টি স্পষ্ট যে, বিদেশি একটি পক্ষপাতমূলক সম্প্রচার মাধ্যমে ড. ইউনূস বাংলাদেশের বিচার বিভাগের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাইছেন। তিনি বাংলাদেশের বিচার বিভাগকে হেয় করতে চেয়েছেন।

DYGBএদিকে ড. ইউনূস নিজেকে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দাবি করলেও আসলে এই ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো সরকারিভাবে। ১৯৮৩ সালে রাষ্ট্রপতির অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে একটি সংবিধিবদ্ধ সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে গ্রামীণ ব্যাংক। আর ড. ইউনূস ছিলেন এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সরকারের নিযুক্ত ও বেতনভুক্ত একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক; কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠাতা নন তিনি।

গত পহেলা জানুয়ারি শ্রম আইন লঙ্ঘনে দায়ে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ টেলিকমের তিন শীর্ষ কর্মকর্তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে শ্রম আদালত।

ইউনূসের বিরুদ্ধে আনা কল্যাণ তহবিলে নির্দিষ্ট লভ্যাংশ না দেয়া, শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী না করা, গণছুটি নগদায়ন না করার মতো অভিযোগগুলো আদালতে প্রমাণিত হয়েছে।

সাজা পেয়ে শ্রম আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে ইউনূস। তার বিরুদ্ধে রয়েছে আরও অনেক মামলা। গ্রামীণ টেলিকমের কর্মীদের লভ্যাংশের ২৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে একটি মামলায় ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে দুদক।

২০০৭ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের তখন গ্রেফতার করে কারাগারে আটকে রাখা হয়।

DYআর সেই রাজনীতি নিষিদ্ধ ও রাজনীতিবিদদের জেল-জুলমের সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নতুন একটি রাজনৈতিক দল খুলতে মাঠে নামেন। জরুরি অবস্থার মধ্যেই তিনি নাগরিক শক্তি নামের রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য ব্যাপক তোড়জোড় চালিয়েছিলেন, যা নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হয়।

এ বিষয়ে ড. ইউনূস বলেন, রাজনীতির সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ওয়ান ইলেভেনে তাকে সরকার প্রধান হওয়ার প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি বারবার বলেছি, রাজনীতি করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই।

[মেয়ের পর এবার ড. ইউনূসের সাক্ষাৎকার ইসরাইলের পক্ষে থাকা সিএনএন চ্যানেলে ]

তবে উইকিলিকস থেকে ফাঁস হওয়া গোপন নথিতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রধান দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে নির্বাসনে পাঠাতে চেয়েছিলেন এই নোবেলজয়ী। জেনারেল মইন ইউ আহমেদের লেখা বই এবং আরও কিছু নথি থেকে এটি স্পষ্ট ছিল যে, ১-২ বছরের জন্য নয়, বরং দীর্ঘ মেয়াদে অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক সরকার গঠনের জন্য ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন ড. ইউনূস।

আরও পড়ুন :