ডিজইনফো

‘ডিজইনফো ফাইটার’ হয়ে যখন ভুল তথ্য ছড়ান জিল্লুর রহমান

ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের টকশোতে ডেকে এনে উদ্দেশ্যমূলক প্রশ্ন করে বিভ্রান্তি করা, কোনো তথ্য ভুল বললেও সেগুলোর পাল্টা জবাব না দিয়ে ভুল তথ্যকে প্রশ্রয় দেওয়া, আবার ওই টকশোর বিভ্রান্তিকর অংশগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চটকদার হেডলাইন দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া- এমন কাজ যেনো তেনো ইউটিউবারের নয় বরং ‘ডিজইনফো ফাইটার’ হিসেবে মার্কিন বেসরকারি সংস্থা ন্যাশনাল এনডৌমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির (এনইডি) ফান্ড লাভ করা উপস্থাপক জিল্লুর রহমানের। বিগত বছর জুড়ে তার কার্যক্রম এভাবেই দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

উপস্থাপক হলেও অনেক সময়ই নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে উপস্থাপন করেন জিল্লুর রহমান। তিনি সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) নামের একটি সংস্থার প্রধান, যার অর্থায়নে রয়েছে মার্কিন বেসরকারি সংস্থা এনইডি।

জাতিসংঘ জরুরি শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) ব্যখ্যা অনুযায়ী, একজন ফ্যাক্ট চেকারকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ব্যক্তিগত কথাবার্তা উভয় ক্ষেত্রেই বস্তুনিষ্ঠ এবং নিরপেক্ষ হতে হবে। । তবে এ দিক দিয়ে পুরোটাই ভিন্ন রূপে দেয়া যায় উপস্থাপক জিল্লুর রহমানকে। সম্প্রতি নিজের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে আরব বসন্তের সঙ্গে মিল রেখে তিনি বাংলা বসন্তের কথা বলছেন। বিষয়টিকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে থেকে উস্কানি হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র আরব বসন্তের নামে যে মধ্যপ্রাচ্যকে ধ্বংস করেছিল। দেশবিরোধীরাও এখন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তেমনটি চাইছে। আর এ ক্ষেত্রে বাংলা বসন্ত নাম দেয়ার অর্থ হলো একজন অসচেতন নাগরিক হিসেবে নিজ দেশের ধ্বংসকে স্বাগত জানানো।

Journalism, ‘Fake News’ and Disinformation: A Handbook for Journalism Education and Training

শুধু আরব বসন্তের কথা বলেই খ্যান্ত হননি জিল্লুর। তিনি বাংলাদেশে মার্কিন হস্তক্ষেপ নিয়েও নিয়মিত তার টকশো এবং ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্টে কথা বলে গেছেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করার মতই কথা বলেছেন তিনি।

তৃতীয় মাত্রার উপস্থাপক জিল্লুরকে বিভিন্ন সময় জামাত-বিএনপির হয়ে কথা বলতে দেখা গেছে। দল দুটির মতো তিনিও বিভিন্ন বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়েছেন। তাঁর তৈরি কনটেন্টের মধ্যে রয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে খুন করা কর্নেল আবদুর রশীদের সাক্ষাৎকার। ওই সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছিল পাকিস্তানের মাটিতে। আর এই সাক্ষাৎকারে এই খুনিকে তার নিজ পক্ষে সাফাই গাইতে সুযোগ করে দিয়েছিলেন জিল্লুর রহমান।

বাংলাদেশের আদালতে সাজাপ্রাপ্ত একজন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়ে এভাবে তা দেশে প্রচারের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা ছিলো সেখানে। বিশ্লেষকদের মতে, কোন গণতান্ত্রিক দেশে এভাবে পলাতক আসামীর সাক্ষাৎকার রেকর্ড করে সাফাই গাওয়ার সুযোগ দেয়ার মতো লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেনি। সেই সঙ্গে বিষয়টি দেশের বিচার বিভাগকে অবমাননা করার মতোও বিষয়। অবশ্য জিল্লুরের জন্য বিষয়টি নতুন নয়। প্রায়ই দেশের বিভিন্ন বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে নিজ টকশো এবং ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কটাক্ষমূলক প্রশ্ন করে গেছেন জিল্লুর।

করোনা মহামারির সময়ে রোগীদের চিকিৎসা এবং টেস্ট নিয়ে প্রতারণা করা রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদকে টকশোতে ‘রাজনৈতিক বিশ্লেষক’ হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন জিল্লুর রহমান। ২০১৫ সাল থেকে তৃতীয় মাত্রায় দেখা গেছে সাহেদকে। এমনকি সাহেদের যেসব বক্তব্য সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে, তাও তৃতীয় মাত্রার মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

বছর দুই আগে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জিল্লুর রহমান বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে এসব কিছুকে আমি থোড়াই কেয়ার করি। আমার এখন এসব কিছু কেয়ার করার সময় নেই। যদি আপনি এসব কিছু মাথায় নেন, তাহলে সামনে এগোতে পারবেন না।’

এদিকে জিল্লুর রহমান সিজিএস নামন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে প্রায়ই গোল টেবিল বৈঠকের আলোচনা করেন। এ ধরণের আলোচনায় অংশগ্রহণ করা একাধিক বক্তা গোল টেবিলে তার সঞ্চালনা ও বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করেন। সেই সঙ্গে তারা জানান, প্রায়ই গোল টেবিল বৈঠকে দেয়া বক্তব্যের একটি অংশ কেটে প্রচার করেন জিল্লুর, যা তার সম্পূর্ণ বক্তব্যকে বা সত্যিকার বার্তা প্রদান করে না।

এ ছাড়াও সিজিএস এর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা ইচ্ছা করে পক্ষপাত স্যাম্পলিং এর মাধ্যমে গবেষণা করে তার ফলাফলকে প্রভাবিত করে উপস্থাপন করেছে। এরপর এই ধরণের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোতিত প্রশ্ন তারা করেছে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের। সেখান থেকেই জিল্লুর রহমান তার ইচ্ছাধিন মত কূটনীতিকদের বাছাই করা বক্তব্য বা বক্তব্যের অংশ প্রচার করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

জিল্লুর রহমান তার টকশো তৃতীয় মাত্রা এবং ব্যক্তিগত প্রোফাইলে বিগত কয়েক মাস ধরে যা ভিডিও টাইটেল, ক্যাপশন ও থাম্বনিল শেয়ার করেছেন তাকে মোটা দাগে তিন ভাগে ভাগ করা যায়, এর মধ্যে একটিZillur Rahman বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য সহ পশ্চিমা দেশগুলো, সরকারের পতন কবে হচ্ছে বা শিগগিরই হচ্ছে, দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই। মজাদার বিষয় হলো একটি দেশের অভ্যন্তরে থেকে সেই দেশের সরকার পতনের দিন তারিখ বারবার জানাচ্ছেন জিল্লুর রহমান। সেই সঙ্গে অপর একটি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের কথা বার বার প্রচার করে যাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে এখনও কোন সমস্যার মুখে পড়েননি তিনি। কিন্তু তারপরও তারই কাছে ‘দেশের গণমাধ্যম স্বাধীন নয়’ কথা শোনা যাচ্ছে।

[‘ডিজইনফো ফাইটার’ হয়ে যখন ভুল তথ্য ছড়ান জিল্লুর রহমান]

বাংলাদেশে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে অতীতে এবং বর্তমানে ফান্ড করে যাচ্ছে মার্কিন সংস্থা এনইডি। মার্কিন সংস্থা এনইডিপ্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে গণতন্ত্র সুরক্ষায় তাদের মূল কার্যক্রম বলে উল্লেখ করা হয়। সম্প্রতি সময় মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট সহ আরও বেশ কিছু ফোরামের আলোচনায় গণতন্ত্র সুরক্ষায় সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে- গুজব (রিউমার), বিভ্রান্তি এবং ভুল তথ্য (ডিজইনফরমেশন) এবং ভুল বার্তা দেয়া (মিস লিডিং)। একজন ডিজইনফো ফাইটার হিসেবে এ সবগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করা উচিত ছিলো জিল্লুর রহমানের। কিন্তু এনইডি ফান্ডের মাধ্যমে উল্টো বিভ্রান্তিকর ও ভুল তথ্য ছড়াবার পাশাপাশি ‘ক্লিক বেইট’ হিসেবে চটকদার সব শিরোনাম ও থাম্ব দিয়ে ভিডিও শেয়ার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন জিল্লুর।

একজন উপস্থাপক হিসেবে ‘ফেব্রুয়ারির মধ্যে কী সরকার পতন হচ্ছে’ এমন প্রশ্ন রাখা কোনভাবেই নিরপেক্ষ অবস্থান নয় বলে মনে করেন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কিন্তু এমন সব প্রশ্ন দিয়ে ভিডিও তৈরি করছেন জিল্লুর। যা একজন উপস্থাপক হিসেবে তার নিরপেক্ষ অবস্থান ও বস্তুনিষ্ঠতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আরও পড়ুনঃ 

  1. তৃতীয় মাত্রার অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর খুনি আবদুর রশিদ
  2. তারেকের মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণেই বিএনপিতে ভাঙ্গন।
  3. মার্কিন সংস্থাকে বিএনপির বিপুল অর্থায়নের নথিপত্র ফাঁস