মানবাধিকার

বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিপক্ষে প্রায়ই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গোষ্ঠীকে ‘মানবাধিকার’ ইস্যুকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা গেছে। শুধু আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলো নয়, এ ক্ষেত্রে সহায়তা করে এসেছে দেশের বেশ কিছু সংগঠন যাদের নিরপেক্ষভাবে মানবাধিকার ইস্যুতে কাজ করার কথা থাকলেও ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে বাস্তবে।

খালেদা_জিয়াবাংলাদেশে মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে রাজনীতির সবচাইতে লজ্জাজনক ঘটনাটি ঘটান বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া। যিনি ২০১৩-১৪ সালে অসংখ্যবার দাবি করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের লোকজন দেশের ৩৪ জেলায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ২৪২ জন নেতা-কর্মীকে হত্যা করেছে। যদিও ওই ২৪২ জনের মধ্যে মাত্র পাঁচজন ‘ভুক্তভোগীর’ নাম দিয়েছিলেন তিনি। এ বিষয়ে দলটির পক্ষ থেকে একটি তালিকাও প্রণয়ন করা হয় ১৫২ জনের। কিন্তু দেখা যায়, সেই তালিকায় মাত্র ১৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। যাদের নিখোঁজের সঙ্গে সরাসরি সরকারি দলের যোগ রয়েছে বলেও প্রমাণ মেলেনি। এ বিষয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় খোঁজ নিয়ে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

আরও পড়ুন : আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোতে টাকা ঢালছে তারেক-জামায়াত

বিএনপিবর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৮ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর এটা ছিলো মানবাধিকার নিয়ে বড় ধরণের রাজনৈতিক অপপ্রচারের শুরু। এরপর ‘অধিকার’ নামের একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে ২০১৩ সালের ৫-৬ মে শাপলা চত্তরে হেফাজত ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে অপপ্রচার করা হয়। প্রাথমিকভাবে কয়েক হাজার মানুষ এই সমাবেশে এসে মারা গেছে বলে ধারণা প্রকাশ করে ‘অধিকার’ নামের এই সংগঠন। পরবর্তীতে তারা ৬১ জনের তালিকা প্রকাশ করে এবং দাবি করে এই ৬১ জন মারা যায় এই সমাবেশে এসে। যাদের হত্যা করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যরা। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই তালিকার ব্যক্তিদের কোন বিস্তারিত তথ্যই প্রকাশ করতে পারেনি অধিকার। বরং তাদের এই ভুলের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবার কারণে দেশের বিচার বিভাগ শাস্তি প্রদান করে সংগঠনটির সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তিদের।

আরও পড়ুন : শাপলা চত্বর তাণ্ডবে হেফাজতের পেছনে বিশাল বিনিয়োগ ছিল বিএনপির, আদিলুর সেই ষড়যন্ত্রেরই অংশ

কিন্তু তারপরও থেমে থাকেনি তারা। বাংলাদেশে গুম ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয় গুমবিষয়ক জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপের মাধ্যমে। এই তালিকাটি প্রণয়ন করা হয় বাংলাদেশের কিছু মানবাধিকার সংগঠনের বরাত দিয়ে। যা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন দেশের অভ্যন্তরের ও বাহিরের বেশ কয়েকজন মানবাধিকার কর্মী। তাদের ভাষ্যমতে, গুম ও হত্যাকাণ্ড বিষয়ক এ ধরণের ভুল প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হলে যেমন মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পায়, সেই সঙ্গে এ ধরণের হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারগুলোর বিচার পাওয়ার পথেও বাধা তৈরি হয়। এই প্রতিবেদনে ভারতের নাগরিক এবং দেশটির বিচ্ছিন্নতাবাদী দলের সদস্যের নামও গুমের তালিকায় প্রদান করা হয়, যা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে জাতিসংঘের এই ওয়ার্কিং গ্রুপ।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে নিয়ে একইভাবে পক্ষপাতমূলক সমালোচনা করে এসেছে আন্তর্জাতিক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। বিশেষত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে জামায়াত ইসলাম সহ ১৯৭১ সালে হত্যা, গুম, লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে জড়িত দলটির নেতাদের পক্ষ হয়ে কাজ করতে দেখা যায় সংগঠনটিকে। এ সময় বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলে সমালোচনার মুখে পড়ে সংগঠনটি। এরপর থেকেই বাংলাদেশে মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে জামায়াত ইসলামের লবিস্ট ও বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠির মুখপাত্র হিসেবে কাজ করা ‘অধিকার’ এর মত সংগঠনগুলোর তথ্যকে ব্যবহার করে আসছে এইচআরডব্লিউ।

শুধু তাই নয়, বিএনপির জানানো তথ্যকে কোন যাচাই-বাছাই ছাড়াই ব্যবহার করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। তারা প্রতিবেদনে জানিয়েছে ১০ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের কারাগারগুলো ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট বন্দীর সংখ্যাপর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১০ হাজার জন অতিরিক্ত বন্দী থাকার বিষয়টি একেবারেই অমূলক এবং অবান্তর। সেখানে মানবাধিকার বিষয়ক সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে কোন আলোচনাই স্থান দেয়া হয়নি।

আরও পড়ুন : All for father-in-law

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এর নির্বাহী পরিচালক এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করছেন ড. কামাল হোসেনের মেয়ে সারা হোসেন। ড. কামাল হোসেন ২০১৮ সালে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে নেতৃত্ব দেন। মূলত সরকার বিরোধী সকল দলকে নিয়ে জোট করেছিলেন তিনি। অন্যদিকে সারা হোসেনের স্বামী ডেভিড বার্গম্যান। বিগত ৫ বছর ধরেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মনগড়া তথ্য উপাত্ত প্রকাশ করে যাচ্ছেন তিনি। যার মধ্যে অন্যতম একটি ছিলো, ‘করোনাকালে দেশের কয়েক লাখ লোক মারা যাবে স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনায়’- এমন ভবিষ্যত বাণী। ডেভিড বার্গম্যানও যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছিলেন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) চেয়ারপারসন আইনজীবী জেড আই খান পান্না দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘একদলীয় এবং একপাক্ষিক’ বলে অভিহিত করেছেন। তাদের হিসেব অনুসারে বিএনপি ও সমমনা দল ছাড়া জাতীয় পার্টি বা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা অপর দলগুলোর কোন গুরুত্ব নেই।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল ১৯

মূলত দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিবেশের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করার কথা ছিলো সকল মানবাধিকার ভিত্তিক সংগঠনের। কিন্তু বিদেশি বেশ কিছু সংস্থার অর্থায়নের মাধ্যমে এবং নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে মানবাধিকার নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের সত্যিকার অর্থে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করছে যেই সংগঠন ও সংগঠকরাও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক মানবাধিকার ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কাজ করে যাওয়া ব্যক্তিরা।

[নির্বাচন বন্ধের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে আরও একবার ‘মানবাধিকার’ ইস্যু নিয়ে রাজনীতি]

তাদের ভাষ্য মতে, মানবাধিকার নিয়ে কাজ করতে হলে শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের জন্যই কাজ করা উচিত। এখানে অন্য কোন এজেন্ডা বা ব্যক্তিগত রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করলে তা সর্বপরি অধিকার আদায়ের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন :