বিএনপির ভারত নীতি প্রকাশ্যে বিরোধিতা, গোপনে সমঝোতা চেষ্টা

গোপনে ভারতের অনুগ্রহ পাওয়ার চেষ্টা করলেও প্রকাশ্যে ভারত বিরোধিতার নীতি বলবৎ রেখেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সম্প্রতি বিএনপি ও তার সমর্থকরা ভারতের পণ্য বয়কটের ডাক দেন। কিন্তু দলটির বিভিন্ন পর্যায় থেকে ভারতের অনুগ্রহ লাভের চেষ্টার বিষয়টি বেশ স্পষ্ট।

একটি বিদেশি সংবাদমাধ্যমে বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত আসিফ নজরুল জানান, ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাকটা এসেছে সর্বশেষ নির্বাচনে ভারত যেভাবে হস্তক্ষেপ করেছে তার অআরণে। যদিও এই বক্তব্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সমর্থন করে বলেন, বাংলাদেশে সাধারণ ভাবে মানুষের বিশ্বাস আমেরিকা যে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রচেষ্টা নিয়েছিল ভারতের কারণে তা সম্ভব হয়নি। ভারতের কারণে সরকার আত্মবিশ্বাস পেয়েছে একতরফা ভাবে নির্বাচন করার জন্য।

এ সময় মালদ্বীপের চীনাপন্থী সরকারের সম্প্রতি ভারত বিদ্বেষী অবস্থানকে উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি এবং বলেন, মালদ্বীপেও ভারতের বিরুদ্ধে এমন প্রচারণা আছে। ভারতীয়রা যাতে সেখানে শুটিং করতে না যায়, তেমন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

‘ব্যক্তিগতভাবে আমি এমন মুভমেন্টের পক্ষে বা বিপক্ষে কোন কিছুতেই না’- এমন মন্তব্য করলেও বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর ভারতীয় পণ্য বর্জন ক্যাম্পেইনকে ‘জনগণের দাবি’ বলে বর্ণনা করেছেন তিনি অনেকটা বিএনপি নেতাদের মতোই। সেই সঙ্গে ভারতের বেশ কিছু পণ্য বর্জন করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে একই ভাষায় ভারতের সমালোচনা করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের অবস্থানের সমালোচনা করে রুহুল কবির বলেন, ‘ভারত সরকার ও তাদের দেশের রাজনীতিবিদদের বোঝা উচিত, বাংলাদেশের জনগণ কেন তাদের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে। একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারকে সমর্থন দিয়ে তারা (ভারত) বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।’

রুহুল কবির বলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে রক্তাক্ত সীমান্ত এখন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। প্রায় প্রতিদিন বিএসএফ সেখানে বাংলাদেশিদের গুলি করে হত্যা করছে।’

বাণিজ্যে ভারসাম্য না থাকার বিষয় উল্লেখ করে রুহুল কবির বলেন, তারা (ভারত) বাংলাদেশে একতরফা বাণিজ্য করলেও বাংলাদেশকে কোনো ব্যবসা করার সুযোগ দিচ্ছে না। বাংলাদেশ থেকে তারা নানা উপায়ে হাজারো কোটি টাকা রেমিট্যান্স নিয়ে যাচ্ছে।

জানুয়ারি মাসে বিএনপি নেতা এ বক্তব্য দিলেও ভোটের মাত্র দুই মাস আগে ভারতের অনুগ্রহ পাওয়ার চেষ্টা করেছিল বিএনপি। সে সময় এক বৈঠকে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে দলের নেতারা চান সহযোগিতাও। এছাড়াও গোপনে সমঝোতা চেষ্টা করার কথাও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।

বিএনপির সাবেক নেতা সমশের মবিন চৌধুরী ২০২৩ সালে বলেন, একটি বিষয় তৈরি হয়েছিল যে বিএনপি মানেই ভারতবিরোধী। বিশেষ করে জামায়াত সঙ্গে থাকায় এটি আরও বেশি প্রকাশ পেয়েছে। তো এখানে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ভারতের সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি করার এবং আমি বিএনপি থেকে দেওয়া সে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। আপনারা দেখলেন যে ২০১৩ সালে যখন খালেদা জিয়া ভারত সফর করলেন, তখন ভারত সরকার তাঁকে একেবারে সরকারপ্রধানের সমমর্যাদা দিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। তখন খালেদা জিয়া কয়েকটি প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয় ছিল। সে জন্য ২০১৩ সালে ভারত সফরের সময় খালেদা জিয়া সেখানে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রতিশ্রুতির একটা ছিল, বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিএনপি কারও দ্বারা প্রভাবিত হবে না। এ ব্যাপারে বিশেষ করে জামায়াতের কথা বলা হয়েছিল। এ ছাড়া ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যেন বাংলাদেশে কোনো প্রশ্রয় না পায়, সে ধরনের পদক্ষেপ বিএনপি নেবে।

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি (প্রয়াত), এই তিনজনকেই ওই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল এবং এভাবে আলাপ–আলোচনা হয়েছিল। তখন প্রণব মুখার্জি এটাও বলেছিলেন যে ‘ম্যাডাম (খালেদা জিয়া), আমরা তো আপনার সঙ্গে অতীতে কাজ করেছি, আগামীতেও কাজ করতে পারব।’ প্রণব মুখার্জির মতো লোকের এই কথায় কিন্তু অনেক ইঙ্গিত ছিল। তারপর যখন প্রণব মুখার্জি ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঢাকা সফরে এলেন, বিএনপি প্রধানের সঙ্গে ওনার একটা সাক্ষাৎ ঠিক করা হয়েছিল। সেই সাক্ষাতের দিনের আগের রাতে উনি (খালেদা জিয়া) ঠিক করলেন যে উনি সাক্ষাৎ করতে যাবেন না। কারণ, ওই দিন জামায়াত হরতাল ডেকেছিল। তো উনি (খালেদা জিয়া) প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলেন। যেটা ভারত ভালোভাবে নেয়নি।

[বিএনপির ভারত নীতি: প্রকাশ্যে বিরোধিতা, গোপনে সমঝোতা চেষ্টা]

ভারত ইস্যুতে বিএনপির অবস্থানকে ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ বলে অভিহিত করেছেন ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত। তিনি বলেন, রাজনৈতিক নীতির কারণে ভারত বিরোধী অবস্থান নিতে পারে একটি দল। যেমনটা জামায়াত করেছে এবং করে যাচ্ছে। কিন্তু বিএনপি যা করছে তা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ছাড়া কিছু নয়। সিঙ্গাপুরে গিয়ে সিনিয়র তিনজন নেতা ভারতের সহায়তা চাইলেন, আর দেশে বসে ভারত বিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন অপর এক নেতা।

আরও পড়ুনঃ