টিআইবি- ম্যান্ডেট বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ সংস্থা

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বা টিআই বিশ্বের ৭০টি দেশে অলাভজনক সংস্থা (এনজিও) হিসেবে কাজ করছে। যার একটি শাখা বাংলাদেশে টিআইবি নামে কাজ করছে। সাধারণ মানুষের কাছে দূর্নীতির তথ্য তুলে ধরাই তাদের মূল লক্ষ্য। টিআই বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে থেকে দূর্নীতির বিস্তৃতি বিষয়ে জরিপ পরিচালনা করে। বাংলাদেশেও তারা একই লক্ষ্যে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। টিআইবি’র মেনিফেস্ট থেকে জানা যায়, জবাবদিহিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শাসনামলেই ট্রাস্ট হিসেবে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৯৮ সালে নিবন্ধিত হয়। সংস্থাটি নিজস্ব উৎস থেকে স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে সংগৃহীত ডেটা বিশ্লেষণ করে দুর্নীতির সূচক নির্ধারণে কাজ করে বলে দাবি করা হয়।

বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলে (২০০১-২০০৬ সাল) যখন দেশে গণমাধ্যমের সংখ্যা ছিল হাতেগোণা, সাংবাদিকরা প্রচন্ড নির্যাতন ও ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতেন, তখন টিআইবি’র তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই খালেদা জিয়া সরকার টানা ৫ বছর দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের কলঙ্কজনক খেতাব পেয়েছিল। যা বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বে হেয় প্রতিপন্ন করেছিল। যদিও খালেদা জিয়ার সরকার টিআইবি’র সেই তথ্য-উপাত্তকে পক্ষপাতদুষ্ট অভিযোগ তুলে প্রত্যাখ্যান করেছিল প্রতিবারই। সেসময় টিআইবি বাংলাদেশের রাজনীতি বা নির্বাচন নিয়ে মোড়লিপনা করা বা আগবাড়ানো মন্তব্যের সুযোগ পেত না। কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টিআইবি নিজেদের গন্ডির বাইরে অনেক বেশি স্বাধীনতা উপভোগ করছে। বিদেশি ফান্ডে পরিচালিত এনজিওটি এখন রাজনৈতিক দলের ভূমিকায় নেমেছে। বর্তমানে দেশের গণমাধ্যম উন্মুক্ত, অসংখ্য প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া কাজ করছে, গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে অবাধ মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে, সাংবাদিকরা চাপমুক্ত ও জবাবদিহিতা ছাড়া লেখালেখি করছেন, সরকারের বিরুদ্ধে যাচ্ছেতাই লেখার সুযোগ রয়েছে, সেই সুবর্ণ সময়ে টিআইবি এখন অবতীর্ণ হয়েছে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল হিসেবে।

টিআইবি’র খোলস পরিবর্তন:

মেনিফেস্টে টিআইবি’র কর্মপরিধি সম্পর্কে যতটা বলা হয়েছে, বাস্তবে তাদের বিস্তৃতি অনেক বেশি। বিএনপি-জামায়াত জোট আমলের চেয়ে বহু গুণ বেশি গণমাধ্যম রয়েছে এখন দেশে। অবাধ তথ্য প্রবাহের এই সময়ে টিআইবি বহু চেষ্টা করেও দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশকে আর আগের মত কলঙ্কজনক অবস্থানে দেখাতে পারেনি। অর্থাৎ বিগত সরকারের চেয়ে বর্তমান সরকার অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে দেশ পরিচালনা করছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা দেয়া বর্তমান সরকারের সময়ে দুর্নীতি একেবারে বিলুপ্ত না হলেও অন্তত আগের পর্যায়ে নেই, এটা পরিস্কার। টিআইবি তাই তাদের কাজের ধরণ বদলে ফেলেছে। মূল প্রতিষ্ঠান টিআই’র কাছে গুরুত্ব টিকিয়ে রাখতে, নিয়মিত ফান্ড পেতে তারা নানারকম কন্সপাইরেসিতে লিপ্ত। ২০১৮ সালে টিআই কর্তৃক প্রকাশিত ‘দুর্নীতির ধারণা সূচক’ বা সিপিআই-২০১৮ তে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে তথ্যগত মিথ্যাচার চালায় টিআইবি। প্রকাশিত প্রতিবেদনকে গোঁজামিল এবং উল্টোভাবে উপস্থাপন করে সমালোচনার মুখে পড়েছিল সংস্থাটি।

সম্পূর্ণ দেশিয় স্বসুশীলদের নিয়ে গড়া একটি ট্রাস্টি বোর্ড আছে টিআইবি’র। তাদের কর্পোরেট সংগঠন আছে, তাতে নিজস্ব আয়-ব্যয়ও আছে। অথচ সংস্থার ওয়েবসাইটে দেয়া আয়ের হিসাব ট্রান্সপারেন্ট নয়, বিস্তারিত কিছু নেই। কার কাছ থেকে কী বলে বা কী পারপাসে কত টাকা বা ডলার কী শর্তে নিয়েছে, তার উল্লেখ নাই- শুধু একটা থোক পরিমাণ দেখানো আছে। দুর্নীতির ধারণাসূচক বা সিপিআই বিশ্বব্যাপী পরিচালনা ও প্রকাশ করে টিআই। সেকণ্ডারি ডাটাভিত্তিক ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতিতে সূচকটি করা হলেও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আছে, কারণ সব দেশের জন্য একই পদ্ধতি। সেই সূচক ওয়েবসাইটে সারা বিশ্বের জন্য প্রকাশের পর টিআইবি একটা সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের সহি টিআই হিসেবে জাহির করে। বাকি সারাবছর টিআইবি আর যা যা উৎপাদন করে, সবই তাদের দোকানের নিজস্ব পণ্য, যার মেথোডোলজি, ডাটা ইন্টেগ্রিটির সাথে টিআই-এর কোনো সম্পর্ক নাই। টিআইবি বিশ্বব্যাংক ও মার্কিন সুশীল মহলের সাথে গলা মিলিয়ে বলেছিল পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি হয়েছে। কানাডার আদালতে সেই দাবি মিথ্যা প্রমাণ হওয়ার পর টিআইবি বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চায়নি জাতির কাছে।

টিআইবি-তে ব্যক্তি শীর্ষ পর্যায়ে যারা রয়েছেন, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তারা অনেকেই বিতর্কিত চরিত্রের অধিকারী। আসুন তাদের সম্পর্কে জানা যাক।

বিতর্কিত ব্যক্তিবর্গ টিআইবিতে:

বদিউল আলম মজুমদার। টিআইবি’র উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। প্রচন্ড আওয়ামী-বিরোধী এই ব্যক্তি। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নামে মার্কিন ফান্ডেড একটি এনজিও চালান তিনি। যদিও নিজেকে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ পরিচয় দেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘দি হাঙ্গার প্রজেক্ট’-এর বাংলাদেশ শাখার পরিচালক ও বৈশ্বিক সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্বে আছেন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করায় অভিযুক্ত ইউএসএআইডি-এর সাথেও তার সম্পৃক্ততা পুরনো। সংস্থার ‘পলিসি ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যানালাইসিস গ্রুপ’ প্রকল্পে চিফ টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজর হিসেবে যুক্ত। অর্থাৎ ঘুরেফিরে মার্কিন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ততা তার। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য মতে, বদিউল সিআইএ’র সাথেও সম্পৃক্ত। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে বদিউল যুক্তরাষ্ট্রে যান। দেশের ক্রান্তিকালে ছিলেন অনুপস্থিত। অদ্ভূত ব্যাপার, বাণিজ্য অনুষদের ছাত্র বদিউল মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসায় পরামর্শক ছিলেন। ২০১৮ সালে তার বাড়িতে সিআইএ’র সমন্বয়ে এক গোপন বৈঠক হয়, যাতে উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট, ড. কামাল হোসেন, তার স্ত্রী পাকিস্থানি নাগরিক হামিদা হোসেনসহ সরকারবিরোধী অনেকেই।

গভীর রাতের সেই গোপন বৈঠক টের পেয়ে স্থানীয় জনগণ তাদের ওপর চড়াও হন। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে ঢিল-পাটকেল ছোড়েন। মূলত আওয়ামী লীগ সরকার হঠাতে গভীর চক্রান্ত চলছিল। সেই ঘটনার পর বার্নিকাটকে দ্রুত প্রত্যাহার করা হয়। এই বদিউল আলম পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির গালগল্প প্রতিষ্ঠায় শক্ত ভূমিকা পালন করেন। সেসময় প্রায় প্রতিদিনই তার এসব গালগল্প প্রথম আলোসহ একই ঘরানার বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। দেশবাসীর কাছে ধিকৃত এই বদিউল পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের কাছে তার তৎকালীন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মিথ্যাচার করে জানান, তিনি এসব বলেননি!

অধ্যাপক পারভীন হাসান। সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির ভাইস-চ্যান্সেলর। টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন। অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল ছিলেন আগে এই পদে। সরকারের সাথে সুলতানা কামালের সুসম্পর্ক থাকায় তাকে সরিয়ে বোর্ডের চেয়ারপারসন পদে বসানো হয় সরকারবিরোধী হিসেবে খ্যাত পারভীন হাসানকে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তারও রয়েছে গভীর সম্পর্ক। পারভীন হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্থাপত্যে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ইসলাম বিষয়ে পড়তে তাকে যুক্তরাষ্ট্রেই যেতে হয়েছে! মার্কিনিদের সুরে সুর মিলিয়ে বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে গলাবাজি করেন এই অধ্যাপক। কিন্তু ১৫ই আগস্ট এবং ২১শে আগস্ট ইস্যুতে সবসময় মুখে কুলুপ তার। ডা. জাফরুল্লাহ ও ডেভিড বার্গম্যান কর্তৃক যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালের প্রচেষ্টা এবং আদালত অবমাননায় সাজা ঘোষণার প্রতিবাদে দেওয়া বিবৃতিতে যারা সাক্ষর করেছেন, তাদের মধ্যে বদিউল আলমের মত অন্যতম হলেন এই পারভীন হাসানও।

আলী ইমাম মজুমদার। টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের মহাসচিব। কট্টর বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত সাবেক আমলা তিনি। বিএনপি সরকারের আমলে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। সেনাসমর্থিত ফখরউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কেবিনেট সচিব ছিলেন। ৭৫-এর ১৫ই আগস্ট এবং ৩রা নভেম্বরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের আমলে দেশ যখন ক্রান্তিকালে, সেই সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিবও ছিলেন আলী ইমাম। জোট সরকারের আমলেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পেশাগত জীবনের পুরোটাই বিএনপি-জামায়াত ও উগ্রবাদীদের পক্ষে কাজ করেছেন তিনি।

আরও পড়ুনঃ মার্কিন গোপন তারবার্তায় বিএনপি-জামায়াত আমলে বিমানের বোয়িং দুর্নীতি ও ঘুষ কেলেঙ্কারি

সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর রাষ্ট্রের সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো যখনই শূন্য হয়েছে, কোনও না কোনোভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে তার নাম। নিজেদের স্বার্থে সিইসি পদেও তাকে চেয়েছিল বিএনপি-জামায়াত। তাকে সিইসি করা হলে তিনি অবধারিতভাবেই আওয়ামী লীগের ক্ষতির চেষ্টা করতেন, বলাই বাহুল্য। তাকে সিইসি করা হয়নি বলে বিএনপি-জামায়াতপন্থীরা শুরু থেকেই নির্বাচন কমিশন নিয়ে নানারকম চক্রান্ত ও সমালোচনা শুরু করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডিগুলো নিয়ে এই সাবেক আমলা সবসময় ছিলেন চুপ। নিজের পিঠ বাঁচিয়ে চলেছেন। ১৫ই আগস্ট ও ২১শে আগস্টের নৃশংসতা নিয়ে কথা বললে বিএনপি-জামায়াতের বিরাগভাজন হননি। জীবন সায়াহ্নে এসেও আনুগত্য করে যাচ্ছেন। এখন মানবাধিকারের নামে ইনিয়ে-বিনিয়ে সরকারের বিরোধিতা করছেন। কিন্তু তার আমলে গুম-খুন হওয়া ২১ হাজার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বেলায় মুখে কুলুপ।

এই বিতর্কিত ব্যক্তিরা বিএনপি-জামায়াত আমলে টিআইবিতে সম্পৃক্ত ছিলেন না। পরবর্তীতে তাদের সেখানে যুক্ত করা হয়েছে। তারা সবাই বর্তমান সরকারের বিরোধিতায় একাট্টা। অর্থাৎ টিআইবি’র নিজেরই যেখানে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে তারা সুশাসন ও দুর্নীতি নিয়ে কথা বলার কোনো অধিকার রাখে না।

টিআইবি’র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য:

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনৈতিকতা, শ্রমিকদের ওপর জুলুম, আর্থিক অনিয়মসহ বহু অভিযোগে মামলা হয়েছে। মামলাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ও শেখ হাসিনা সরকারকে বিতর্কিত করতে ইউনূসের ইজ্জতরক্ষাকারী কমিটি খ্যাত ‘ইউনূস এন্ড ফ্রেন্ডস’-এর মাধ্যমে টিআইবি সংশ্লিষ্টরা প্রচন্ড বিষোদগার শুরু করেন। বিভিন্ন জায়গায় সভা-সেমিনারে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে শুরু করেন। প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ একই ঘরানার পত্রপত্রিকার মাধ্যমে বিবৃতি দেয় সংস্থাটি। যে টিআইবি সুশাসন, স্বচ্ছতা, দুর্নীতি বিরোধী বড় বড় কথা বলে, তারা ইউনূসের অনিয়ম ভুলে তখন পুরোদস্তুর রাজনৈতিক দলের ভূমিকায় নেমে যায়। ইউনূসের মামলা নিয়ে তারা দুদককে জড়িয়ে নানারকম আপত্তিকর মন্তব্য করতে শুরু করে। গত অক্টোবরে ইউনূসের মামলা প্রসঙ্গে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদক রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, ইউনূসের মামলা তার প্রমাণ।

এ বিষয়ে দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান জানান, মিডিয়ায় ড. ইউনূসকে প্রশ্ন করা হয়েছিল মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, তখন ইউনূস নিজেই জানান এটি লিগ্যাল ইস্যু (বিচারাধীন বিষয়) তাই কোনো মন্তব্য করব না; অথচ ইউনূসের চেয়ে আগবাড়িয়ে টিআইবি’র মন্তব্য উদ্দ্যেশ্যপ্রণোদিত। বরং টিআইবি নিজেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়ে কাজ করছে বলে জানান অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম। এই আইনজীবী দুদকের বক্তব্যকে ‘ফলস এবং ফ্যাব্রিকেটেড’ আখ্যা দিয়ে বলেন, টিআইবি বহু আগে থেকেই এসব করে আসছে, এটা তাদের অভ্যাস। টিআইবি তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই বলেছে দুদক রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দুদকের আইনজীবী জানান, রাজনৈতিকভাবে কোনো মামলার সুযোগ নাই দুদকে, বরং দুদকের মামলা হয় যথাযথ নথি ও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে। এসব না থাকলে দুদকের মামলার সুযোগ নাই। নথির ভিত্তিতেই সাক্ষ্য-বিচার, এক্সামিনেশন ও হিয়ারিং হয়। বরং টিআইবি সব ইস্যুতেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই এসব বক্তব্য দিচ্ছে। দুদকের আইনজীবী একটা উদাহরণ দেখান, যা নিয়ে টিআইবি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালিয়েছিল।

দুদকের উপ-সহকারি পরিচালক শরীফ উদ্দিনকে নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক বিতর্ক হয়। দুদক তাকে চাকরিচ্যুত করে। অথচ গুজব ছড়ানো হয়েছিল শরীফ একটি বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছেন বলে তার চাকরি চলে গেছে। বিভিন্ন পত্রিকা শরীফকে নিয়ে নানারকম প্রতিবেদন করে, তাকে সৎ কর্মকর্তা সাজানোর চেষ্টা করে। যদিও পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে শরীফ নিজেই ছিলেন দুর্নীতিবাজ, ঘুষ নিয়েছিলেন কয়েক দফায় সেই প্রতিষ্ঠান থেকে। এসব ঘটনায় অভিযোগ প্রমাণিত হয় আদালতে। বিচারাধীন অবস্থায় সেই শরীফের পক্ষে ক্রমাগত অপপ্রচার চালিয়েছিল টিআইবি। টিআইবি ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে খুরশীদ আলম খান বলেন, আমরা টিআইবিকে ওয়াচডগ মনে করি না। টিআইবি একটা পলিটিক্যাল মোটিভেটেড এনজিও।

টিআইবি কি রাজনৈতিক দল?

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর টিআইবিকে আরও আগ্রাসী ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে। দুর্নীতির তথ্য-উপাত্ত সন্ধান বাদ দিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছে তারা এখন। নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াতের সহিংস কর্মকাণ্ড নিয়ে তেমন সাড়াশব্দ করেনি। যখন সারাদেশে বিএনপি-জামায়াতের আগুনসন্ত্রাস, ভাঙচুর, মানুষ পুড়িয়ে মারার ঘটনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছিল, তখনও তারা ছিল নির্বাক। নভেম্বরের শেষদিকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বলেন, দেশে এত কিছু ঘটে যাচ্ছে, আগুনসন্ত্রাস হচ্ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে, স্কুলে আগুন দিচ্ছে, দেশের জনগণ সিপিডি, টিআইবি, অ্যামনেস্টির বিবৃতি খুঁজছে। এসব সংগঠন কোথায়? তারা চুপ কেন? এভাবে ব্যাপক সমালোচনার পরেও টিআইবি ছিল চুপচাপ। তারপর ডিসেম্বরের ১৯ তারিখ নামকাওয়াস্তে বিভিন্ন পত্রিকায় একটা লিখিত বিবৃতি পাঠান সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। বললেন আন্দোলনের নামে মানুষ পোড়ানোর অধিকার কোনো রাজনৈতিক দলের নেই। কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে এমন ভাসমান বক্তব্যে টিআইবি’র উদ্দেশ্য বোঝা যায়। সংস্থাটির এমন নির্লজ্জ কর্মকান্ডের কারণেই ওই একইদিন টিআইবি ও সুজন-কে ‘ভুয়া’ আখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এরা বিএনপির দোসর।

নির্বাচন নিয়ে টিআইবি’র রঙ্গ-তামাশা:

গতকাল ১৭ই জানুয়ারি টিআইবি ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ট্রাকিং’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনের মাধ্যমে দাবি করেছে, এই নির্বাচন ছিল একপাক্ষিক ও পাতানো। নির্বাচন অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। সংস্থাটি তাদের তথাকথিত গবেষণায় যেসব দাবি করেছে, তা হলো- নির্বাচনে শেষের ১ ঘণ্টায় ১৫.৪৩ শতাংশ ভোটসহ মোট ৪১.৮ শতাংশ ভোট পড়া বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিএনপিসহ ১৫টি নিবন্ধিত দলের অনুপস্থিতি ও তাদের নির্বাচন বর্জনের কারণে অন্তত ২৪১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। দেশে অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাড়া অন্যদলের প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট ছিল না। প্রতিপক্ষের প্রার্থীদের এজেন্টদের হুমকির মাধ্যমে কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়নি। ভোটের আগে ব্যালটে সিল মারা, ভোট চলাকালে প্রকাশ্যে সিল মারাসহ পরাজিত প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অনিয়মের অভিযোগে প্রতিবেদনে এসব তথ্য দেখানো হয়।

এবার একটু বিশ্লেষণ করা যাক। ভোটের হার নিয়ে টিআইবি যে দাবি করেছে, তা বিএনপিসহ নির্বাচন বর্জনকারী বিভিন্ন দলের লোকজনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্টের বক্তব্যের হুবহু অনুরূপ। অথচ প্রকৃত তথ্য ভিন্ন। সিইসি ভোটের হার সম্পর্কে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা হলো, ভোটের দিন দুপুর ২টায় যে শতকরা হার বলা হয়েছিল, তা ছিল অনুমান নির্ভর। কারণ কারণ তখনো ভোটগ্রহণ চলছে, তাই পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পাওয়া যায়নি যেহেতু ইভিএম ছাড়াই ম্যানুয়ালি ভোট গ্রহণ চলছিল। ৬৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের খবর তাৎক্ষণিক পাওয়াও সম্ভব নয়। ভোট গণনা শেষেই পূর্ণাঙ্গ ফলাফল মিলবে। বিকেল ৪টাতেও ভোটগ্রহণ সমাপ্ত হয়নি। যারা তখনও লাইনে উপস্থিত ছিলেন, তাদের ভোটগ্রহণ শেষে প্রার্থী ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের সম্মতিতে সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। তাই শেষ ১ ঘণ্টায় শতকরা হার নিয়ে টিআইবি যে বক্তব্য দিয়েছে, তা অমূলক। টিআইবির দাবি, বিএনপি ও কয়েকটি দল নির্বাচন বর্জন করেছে বলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ ৪৩টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে ২৯টি দল। এমনকি নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপি ছেড়ে বহিষ্কৃত হয়েছেন অনেকেই।

তাহলে তাদের অংশগ্রহণ কেন গ্রহণযোগ্য হবে না টিআইবির কাছে? আওয়ামী লীগ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাড়া অন্যদলের পোলিং এজেন্ট সারাদেশে দিতে সক্ষম, বিএনপি-আওয়ামী লীগ ছাড়া এমন আর কয়টি দল আছে দেশে? কেউ যদি পোলিং এজেন্ট না দিতে পারে, সেটা তাদের রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা। সব দলের সক্ষমতা তো এক নয়। এ কারণে নির্বাচন কেন গ্রহণযোগ্য হবে না? আরেকটি দাবি করেছে টিআইবি, প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের এজেন্টদের নাকি বের করে দেয়া হয়েছে। প্রতিপক্ষ প্রার্থী যদি এজেন্ট দিতে না পারে, তাহলে বের করে দিলো কীভাবে? দুটি দাবিই তো পরস্পরবিরোধী। ভোটের আগে ব্যালটে সিল মারার দাবিও সম্পূর্ণ হাস্যকর। কারণ এই নির্বাচনে ব্যালট পৌঁছানো হয়েছে সকালে ভোট শুরুর আগে। তাই এ সংক্রান্ত দাবি মিথ্যা অবশ্যই। পরাজিত প্রার্থীদের নানারকম অভিযোগের ভিত্তিতেই টিআইবি তাদের গবেষণায় এসব তথ্য সংযুক্ত করেছে। কী হাস্যকর ব্যাপার! তথ্য প্রমাণ ছাড়া মৌখিক অভিযোগ কীভাবে গবেষণার উপাত্ত হতে পারে? নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে অসন্তুষ্টি বা অভিযোগ থাকলে সিইসিতে অভিযোগের সুযোগ রয়েছে, আদালতেও যেতে পারেন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো অভিযোগ মেলেনি। তাহলে টিআইবি’র হাস্যকর গবেষণাপত্র তো এমনিতেই বাতিল মাল।

টিআইবি’র হাস্যকর এই গবেষণার কোনো ইথিক্যাল ভ্যালু নাই। কারণ এই নির্বাচনে টিআইবি’র নিজস্ব কোনো পর্যবেক্ষক ছিল না। তারা মাঠপর্যায়ে এমন কোনো জরিপ চালায়নি যে, যার ভিত্তিতে ভোটের হার সম্পর্কে সিইসির বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। নির্বাচন কেন্দ্র করে তাদের বক্তব্য পুরোপুরি রাজনৈতিক। কোনো তথ্য-উপাত্তভিত্তিক গবেষণালব্ধ প্রতিবেদন নয়। যার উদ্দেশ্যই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, স্বচ্ছতার ও জবাবদিহতার আশায় তারা এই গবেষণাপত্রটি রচনা করেনি। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কথা বলারও কোনো ম্যান্ডেট নেই জার্মানভিত্তিক এই এনজিওটির। নির্বাচনকে পাতানো বলে যে অভিযোগ করেছে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক, তার সপক্ষে কোনো প্রমাণ দেখানো হয়নি গবেষণাপত্রে। কারণ তাদের এই প্রতিবেদনের উপাত্ত হচ্ছে পরাজিত প্রার্থীদের বক্তব্য। যা কোনো গবেষণাপত্রে ডাটা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হতে পারে না। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, নির্বাচনের আগের দিন থেকে শুরু করে নির্বাচনের দিন সারাদেশে অসংখ্য ভোটকেন্দ্রে আগুন লাগানো, কেন্দ্রে ভাঙচুর চালানো, প্রার্থীর সমর্থককে হত্যা করা, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা, বোমা ও ককটেল নিক্ষেপ করে জনমনে ভীতির সঞ্চার করার ঘটনাগুলো টিআইবি’র প্রতিবেদনে ছিল অনুপস্থিত। তাহলে তাদের এই প্রতিবেদনকে গ্রহণযোগ্য কীভাবে বলা যায়?

টিআইবি’র গবেষণার হাস্যকর নমুনায় এটা স্পষ্ট, গবেষণার যে মেথোডোলজি ও ডাটা ইন্টেগ্রিটির বিধিমালা রয়েছে, তার কিছুই অনুসরণ করেনি সংস্থাটি। তারা শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই মনগড়া প্রতিবেদন তৈরি করেছে নির্বাচিত সরকারকে বিতর্কিত করতে। যে গবেষণাপত্রের স্ট্যান্ডার্ড ভ্যালু নেই। ৩০০ আসনের ৬৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের মাত্র কয়েকটি কেন্দ্রের পরাজিত প্রার্থীর কাছ থেকে শোনা কথার ভিত্তিতে তৈরি হাস্যকর এই প্রতিবেদন রচিত হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। শুধুমাত্র পত্রিকার শিরোনামে ঠাঁই পাওয়া এবং সংবাদ আকারে প্রকাশিত হওয়ার পর সেই সংবাদগুলোই আবার তথ্য-উপাত্ত বলে দাবি করা হবে আগামীতে; সেই উদ্দেশ্যেই কাজটি করা হয়েছে। এমনটিই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যে সংস্থার দায়িত্বশীল পদে রয়েছেন বিতর্কিত ব্যক্তিবর্গ, তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবিও তুলেছেন সাধারণ মানুষ।

 

আরও পড়ুনঃ