নির্বাচন

নির্বাচনের যখন আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি, দেশবিরোধী বিভিন্ন অপশক্তি যখন শত চেষ্টা করেও নির্বাচন প্রতিহত করতে ব্যর্থ, বিদেশিদের মাধ্যমে চাপ দিয়েও বাংলাদেশের ওপর স্যাংশন আরোপে ব্যর্থ সেই অপশক্তি, তখন শেষ চেষ্টা হিসেবে দৃশ্যপটে হাজির হলো বিদেশি ফান্ডে চলা এনজিওগুলো। বাংলাদেশে বসে বিদেশি ফান্ডে কাজ করছে, এমন কিছু কুখ্যাত এনজিও উঠেপড়ে লেগেছে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সকল অর্জন কালিমালিপ্ত করতে, সর্বোপরি ভোটারদের বিভ্রান্ত করে ফায়দা হাসিল করতে। এই কুখ্যাত এনজিওগুলোর মধ্যে রয়েছে টিআইবি, সুজন, সিপিডি’র মত প্রতিষ্ঠানগুলো।

যে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ- টিআইবি’র গবেষণার ক্ষেত্র দুর্নীতি, তারা নির্বাচনের আগে দুর্নীতি বাদ দিয়ে রাজনীতি নিয়ে তুমুল সোচ্চার! তাদের বক্তব্যগুলো শুনলে মনে হবে বিএনপি-জামায়াতের কোনো নেতার বক্তব্য। এবার তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ- সিপিডি। তারা হঠাৎ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে এক বিশালাকৃতির অশ্বডিম্ব প্রসব করল। তাদের দাবি- ১৫ বছরে ব্যাংক থেকে ৯২ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে! রীতিমত সংবাদ সম্মেলন করে তারা এই তথাকথিত ‘গবেষণা’ ফলাফল প্রকাশ করেছে। শিরোনামনির্ভর এই গপ্পো যে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অত্যন্ত জঘন্য অপপ্রয়াস, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বর্তমান অর্থবছরের ৬ মাস বাকি থাকতেই নির্বাচনের আগে কেন হঠাৎ তাদের এই তড়িঘড়ি প্রতিবেদন? আসুন দেখা যাক নেপথ্য কারণগুলো।

আরও পড়ুন : দেশকে অস্থিতিশীল করার ব্লু প্রিন্ট বিএনপি-জামায়াতের

গবেষণার নামে বিদেশি ফান্ড নিয়ে বিদেশি বিভিন্ন পক্ষের দালালি করে সিপিডি। দেশের ব্যাংকগুলো থেকে যে ৯২ হাজার কোটি টাকা লোপাটের গল্প ফেঁদেছে তারা, সেটা কিন্তু তাদের একাডেমিক গবেষণার ফলাফল নয়। পত্রিকায় বিভিন্ন সময় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে তারা টুকলিফাই করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে, কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই। পত্র-পত্রিকার কলামে যেসব ব্যক্তিগত ধারণা, তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই লক্ষ কোটি টাকার নিবন্ধ প্রকাশিত হয়, সেসব যোগ করেই সিপিডি’র এই প্রতিবেদন। যাতে রয়েছে বেক্সিমকোকে ২২ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়া নিয়ে ছাপা বানোয়াট প্রতিবেদনও, যা পরবর্তীতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েিছল।

এমন নানাবিধ তথ্য-উপাত্তহীন নিবন্ধ, কলাম, প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে সিপিডি এই ৯২ হাজার কোটি টাকার গল্প ফেঁদেছে। অথচ তারা নিজেদের গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলে দাবি করে। কিন্তু আলোচিত এই প্রতিবেদনটি কোনো গবেষণার ফলাফল নয়, বরং তারা নাকি এটা ধারণা করছে- এমনটাই স্বীকার করেছেন সংবাদ সম্মেলনে। অর্থাৎ এই প্রতিবেদনকে অকাট্য সত্য বলে ধরে নেয়ার কোনো অবকাশই নেই।

সিপিডি’র উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রতিবেদনটিকে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া। অর্থাৎ পত্র-পত্রিকাগুলো সিপিডি’র সরবরাহকৃত এই সংখ্যাকে উদ্ধৃত করতে পারে যেন। রাজনৈতিক দলগুলো এই সংখ্যাকে রাজনৈতিক বক্তব্যে, টিভি টকশোর মাধ্যমে উল্লেখ করে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে পারে যেন। কারণ হাটে-মাঠে দেয়া বক্তব্যের বিপরীতে কোনো তথ্য-প্রমাণ দাখিলের দায় থাকে না। তাই বলা যায়, বারবার বলতে বলতে ৯২ হাজার কোটি টাকার এই গপ্পকে গোয়েবলসীয় পদ্ধতিতে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করাটাই ছিল সিপিডি’র মূল উদ্দেশ্য। অথচ সিপিডি’র তথ্যের সূত্রই হলো পত্রিকায় প্রকাশিত কলাম। অর্থাৎ সিপিডি’র সাক্ষী পত্রিকার কলাম, আবার পত্রিকায় সংবাদসূত্র সিপিডি’র প্রতিবেদন। অর্থাৎ সেই পুরনো কাহিনী- আবুল চোরার সাক্ষী বাবুল বাটপার, বাবুল বাটপারের সাক্ষী আবুল চোরা। চোরের সাক্ষী বাটপার।

৯২ হাজার কোটি টাকা লোপাটের যে গল্প বাজারে ছেড়েছে সিপিডি, তা বিশ্লেষণ করা যাক। সিপিডি কিন্তু জানায়নি, এই ৯২ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ কি জামানতযুক্ত নাকি জামানতবিহীন। অর্থাৎ এখানে একটা বড় ফাঁকিবাজি তারা করেছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো নিয়মিত তাদের অডিট রিপোর্ট প্রকাশ করে, সব তথ্য সেখানে থাকে। কিন্তু সিপিডি সেই অডিট রিপোর্ট যাচাই-বাছাই ছাড়াই পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন কলাম যোগ করে একটা সংখ্যা প্রকাশ করেছে। আর দাবি করেছে গত ১৫ বছরে ঋণের নামে নাকি এই পরিমাণ অর্থ সম্পূর্ণভাবে লোপাট হয়েছে! অথচ একটু যোগ-বিয়োগ জানলেই তাদের এই মিথ্যাচার ধরা পড়ে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১০.১১ শতাংশ। ২০২৩ সালের জুন মাস পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৪২ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। ব্যাংকিং খাতের এই ঋণ খেলাপি হয়েছে কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই, গত ১৫ বছরে নয়। এখন এই ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকার মধ্যে ৯২ হাজার কোটি টাকার পুরোটা লোপাট হয়েছে বলে সিপিডি’র দাবি।

অথচ দেশের আদালতে প্রতিদিনই ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকগুলোর যেসব মামলা চলছে, পত্রিকায় নিয়মিত বন্ধকি সম্পত্তির নিলাম দিয়ে ব্যাংকগুলো তাদের খেলাপি ঋণ উদ্ধার করে সমন্বয় করে, ঋণের একটা অংশ যে ফেরত আসছে- সেসব হিসেব কিন্তু সিপিডি’র প্রতিবেদনে নেই। এই ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকা ঋণের কতটা অংশ গত ১৫ বছরে খেলাপি হয়েছে তা কি সিপিডি উল্লেখ করেছে? করেনি। অথচ তাদের প্রতিবেদন দাবি করছে এই খতিয়ান ১৫ বছরের। তাহলে কি আগের সরকারগুলোর সময় কোনো ঋণ খেলাপি হয়নি?

কেন সিপিডি এই কাজটি করল নির্বাচনের আগমুহূর্তে? কেন চলতি অর্থবছরের ৬ মাস শেষ হওয়ার আগেই এই অর্থবছরের খতিয়ান আগাম তুলে ধরতে গেল? নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করার কাজে উঠে-পড়ে লাগলো কেন সিপিডি? এর নেপথ্য কারণটাও দেখা যাক।

আরও পড়ুন : বাংলাদেশে উগ্রবাদীদের ক্ষমতায় আনতে সুশীলদের পরিকল্পনা

সিপিডি’র সভাপতি রেহমান সোবহান। যাকে বাংলাদেশের একজন বড় অর্থনীতিবিদি হিসেবে প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের মত পত্রিকাগুলো আখ্যা দেয়। ১/১১-তে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামদের মত এই রেহমান সোবহানও কুখ্যাত মাইনাস ফর্মূলার অন্যতম সমর্থক ছিলেন। মার্কিনিদের ইশারায় নাচা রেহমান সোবহান তার প্রতিষ্ঠান সিপিডিকে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সকল অর্জনের ওপর কালিমা লেপন করার জন্য।

প্রায়শ এই পত্রিকাগুলোয় গবেষণা প্রতিবেদনের নামে নানারূপ ভবিষ্যদ্বাণী প্রকাশ করে সিপিডি ও রেহমান সোবহান গং। সরকারের সব পলিসির বিরোধিতা বা সমালোচনা করে নিয়মিত। বিদেশিদের পক্ষ হয়ে নানারকম সবক দেয়ারও চেষ্টা করে। অথচ গত ১০-১২ বছরে তাদের একটা ভবিষ্যদ্বাণীও সফল হয়নি। মূলত বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ওপর রেহমান সোবহানের পুরনো ক্ষোভ রয়েছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রেহমান সোবহান ভেবেছিলেন শেখ হাসিনা তাকে দেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী করবেন কিন্তু শেখ হাসিনা তাকে বাদ দিয়ে শাহ এএমএস কিবরিয়াকে অর্থমন্ত্রী করেন। সেই বেদনা রেহমান সোবহান আজও ভুলতে পারেননি।

[নির্বাচনের আগ মূহুর্তে সিপিডি’র ৯২ হাজার কোটি টাকার গায়েবি গবেষণা : ফ্যাক্ট যাচাই ও নেপথ্য কারণ অনুসন্ধান]

শুধুমাত্র জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে, ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে সিপিডি এই জঘন্য কাজটি করেছে। এটা এখন স্পষ্ট বলা যায়।

আরও পড়ুন :