প্রথম আলো

দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে কটাক্ষ করে ন্যাক্কারজনক ও বানোয়াট প্রতিবেদন তৈরা করায় প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক শামসুজ্জামানকে গ্রেপ্তার এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে প্রতিবেদক ও পত্রিকাটির সম্পাদক মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর বিদেশী একাধিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বিদেশি এসব গণমাধ্যমে যেসব শিরোনাম এসেছে, তাতে মিথ্যা দাবি করা হয়েছে- দ্রব্যমূল্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশের কারণেই নাকি প্রতিবেদক শামসুজ্জামান ও মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছে এবং প্রতিবেদককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অথচ প্রকৃত সত্য হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও প্রতিবেদককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ভুল, অসত্য এবং ‘পলিটিক্যালি ইল মোটিভেটেড’ হয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে প্রতিবেদন করার কারণে। যে বিষয়টি এসব বিদেশি গণমাধ্যমে উল্লেখ্য করা হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিদেশি এসব গণমাধ্যমে শামসুজ্জামান ও মতিউর রহমানকে নিয়ে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে তা মূলত ঢাকার কারওয়ান বাজারের প্রথম আলো অফিস থেকে ‘প্রেস বিজ্ঞপ্তি’ আকারে পাঠানো হয়েছে এবং এর সূত্র ধরেই বিদেশি গণমাধ্যমগুলো এসব প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আর এ কাজে সহযোগিতা করছেন প্রথম আলোর বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন সংবাদকর্মী। সাবেক হলেও এদের অনেকেই প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যাদের কয়েকজনের লেখা বই প্রথমা থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং নিয়মিত রয়্যালটি পাচ্ছেন সেখান থেকে। তাদের সাথে রয়েছেন হেফাজতের আধ্যাত্মিক গুরু ফরহাদ মজহারের কিছু মুরিদ ও দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা।

সূত্র জানিয়েছে, বিদেশি একটি সংবাদ মাধ্যমের জ্যেষ্ঠ এক সাংবাদিক বর্তমানে প্রথম আলোর সাথে কাজ করছেন। বিবিসি বাংলাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সেই সূত্রে সংবাদগুলো প্রকাশের ব্যবস্থা করা হয় বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি সংবাদ সংস্থার ঢাকা প্রধান প্রথম আলোর সাবেক প্রতিবেদক। এ সংবাদ সংস্থাটির ঢাকা অফিসের বেশিরভাগ কর্মীই জামায়াত ও ছাত্র শিবিরের সক্রিয় কর্মী বলে নিশ্চিত তথ্য রয়েছে। বিদেশি বার্তা সংস্থার খবরে শিশু ও দিনমজুর নিয়ে মিথ্যাচার, প্রথম আলোর ফটোস্টোরি বদল, এসব নিয়ে ধুম্রজাল তৈরি করা হয়েছে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে। বিভিন্ন দেশে যারা সেই বার্তা সংস্থার খবর ব্যবহার করছেন, তাদের খবরেই দেখা যাচ্ছে, গ্রেপ্তারের কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি।

[যেভাবে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ইস্যুতে বিদেশি গণমাধ্যমে প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে প্রথম আলো]

জানা গেছে, প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ ভারতের প্রভাবশালী একটি বাংলা ও ইংরেজি সংবাদপত্রের মালিক পক্ষের সাথে যোগাযোগ করেছেন শামসুজ্জামানকে গ্রেপ্তারের পরপরই। বিবিসি বাংলা, আল জাজিরা ও এএফপিসহ যে সংবাদমাধ্যমে প্রথম আলোর পাঠানো বানোয়াট প্রতিবেদন পুনঃপ্রকাশ করেছে, সেই খবরগুলোর লিংক দিয়ে তাদের বোঝানো হয়েছে, দ্রব্যমূল্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরেই প্রথম আলোর বিরুদ্ধে সরকার মামলা দিচ্ছে। অথচ বিদেশি সাংবাদমাধ্যমে যা ছাপানো হয়েছে, সবই প্রথম আলোর সরবরাহকৃত প্রোপাগান্ডা। প্রথম আলো দেশের সর্বাধিক বিক্রিত (পড়ুন: বিকৃত) পত্রিকা- শুধুমাত্র এ কারণে বিদেশি সংস্থাগুলো ধরেই নিয়েছে, তাদের হয়ত বিশ্বাসযোগ্যতা আকাশচুম্বি! এভাবেই প্রথম আলো সবসময় প্রতারণা চালিয়ে আসছে।

সূত্র জানায়, বিভিন্ন দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের মালিক ও সম্পাদকদের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সাথে বিগত দুই বছরে পর্যায়ক্রমে যুক্ত হয়েছেন মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনাম গং। সেই পরিচিতর সূত্রে তারা দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও প্রোপাগান্ডা ছড়াতে শুরু করেছেন। এসব কাজে তাদের পাশে রয়েছে বিএনপির অর্থে পালিত বিদেশি কয়েকটি লবিস্ট ফার্ম। লন্ডন থেকে যাদের জন্য নতুন অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হয়েছে সম্প্রতি। আর এখানে মধ্যস্ততা করছেন ডেভিড বার্গম্যান ও তাসনিম খলিল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাকে উস্কে দেয়ার কাজ করা হচ্ছে এভাবে। অথচ সেসব সংস্থা খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিক নির্যাতন ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে নিশ্চুপ ভূমিকা পালন করছে।

যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকদের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। মার্কিন সংস্থা প্রেস ফ্রিডম ট্র্যাকারের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের প্রথম ৩ মাসে দেশটিতে ১৪ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য, নিপীড়ন ও হুমকি-ধমকির শিকার হয়েছেন। ১৪ জনের মধ্যে ৫ জনকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হয়েছে। ২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে কিংবা গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হুমকি দেয়া হয়েছে একজনকে। তথ্য দিতে অস্বীকার করা হয়েছে ২ জনকে। কাজে বাধা দেয়া হয়েছে দুজনকে। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সরাসরি আক্রমণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৪০ জন, কাজে বাধা দেয়া হয়েছে ১০ জনকে। আদালতের মুখোমুখি হতে হয়েছে ৩০ জনকে।

যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার কিংবা তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ২০২০ সালে। সে বছর মোট ১৪৫ জন গ্রেপ্তার কিংবা মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। সে বছর আক্রমণের শিকার হয়েছেন ৬৩১ জন। ২০২১ সালেও মামলা কিংবা গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হয়েছেন ৫৯ জন। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হন ৫৬ জন। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৩ সালের প্রথম ৩ মাসের হিসাব আমলে নিলে বিগত ৫ বছরে মামলা কিংবা গ্রেপ্তারের শিকার হয়েছেন ২৮৩ জন। সরাসরি হামলার শিকার হয়েছেন প্রায় ১ হাজার তথা ৯৬৪ জন। তথ্য দিতে অস্বীকার করা হয়েছে ৭৬ জন সাংবাদিককে। হামলার কারণে সাংবাদিকতার কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে ২০৩ জনের। আদালতের নোটিশের মুখোমুখি হয়েছেন ১৬৭ জন। দেহ তল্লাশি এবং সরঞ্জাম কেড়ে নেয়া হয়েছে ৮৩ জনের।

[যেভাবে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ইস্যুতে বিদেশি গণমাধ্যমে প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে প্রথম আলো]

পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকদের অবস্থা যতটা ভালো ভাবা হয় বাইরে থেকে, ভেতরে ততটা ভালো নয়। এই অবস্থায় নৈতিকভাবে বাংলাদেশের মতো দেশের বেলায় যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক এসব সংস্থা স্বাধীন সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা শেখানোর সবক দিতে আসতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে ২০২১ সালে কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস বা সিপিজে’র নির্বাহী পরিচালক জোয়ের সাইমন বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের হাতে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও আটক করার জন্য সম্যক কোনো কারণ নেই। তারপরও ২০২১ সালে এ ধরনের ৫৬টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় যে, সমস্যাটি বিশাল আকার ধারণ করেছে।’

এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে এ কারণে, এই পরিসংখ্যানগুলো প্রথম আলো কিংবা ডেইলি স্টারে কখনই প্রকাশিত হয়নি। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক কিছু সংস্থার সাথে কারওয়ান বাজারের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। যারা বিভিন্ন স্বার্থে পরস্পরের পিঠ চুলকে দিয়ে ফায়দা আদায় করে। যেমন এখন বাংলাদেশকে বিতর্কিত করতে উভয় পক্ষ কোমর বেঁধে নেমেছে। যাদের লক্ষ্য একটাই, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নষ্ট করা, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে ব্যবসা-বাণিজ্যকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়া। তারপর জনরোষ সৃষ্টির মাধ্যমে ক্ষমতায় নিজেদের পছন্দমাফিক পুতুল সরকার বসানো। এই লক্ষ্যে কাজ করছে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার গং। এদেরকে প্রতিহত করার সময় এখনই।

আরও পড়ুনঃ