বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

0
148

সর্বস্তরের মানুষের অপরিসীম ত্যাগ ও জীবনের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে বিশ্ব-মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের। ত্রিশ লক্ষ মানুষের জীবনদানসহ এ দেশের স্বাধীনতার জন্য সরকারি হিসেবে দুই লক্ষ, বেসরকারি হিসেবে প্রায় পাঁচ লক্ষ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছেন, পনেরো লক্ষেরও বেশি মানুষ পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এবং তাদের সহযোগী জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম প্রভৃতি দলের বিভিন্ন ঘাতক বাহিনীর হাতে নানাবিধ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এক কোটি মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে গিয়ে শরণার্থীর বিড়ম্বিত জীবন গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন। দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত ছিলেন প্রায় তিন কোটি মানুষ। স্বাধীনতার জন্য বিশ্বের অন্য কোনো দেশের মানুষ এতো জীবনদান, নির্যাতন ও ত্যাগ স্বীকার করেননি।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র জনতা, সর্বস্তরের মানুষ তাতে অংশ নিয়েছেন। বিশেষ গোষ্ঠী বা সংগঠনের বিশেষ কোনো ভূমিকা বা অবদান এতে নেই, তা যেভাবেই দাবি করা হোক না কেন? ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তিসনদ ছয়দফা উপস্থাপন করেন এবং এর সমর্থন আদায়ের জন্য বাংলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ছুটে বেড়ান। বাঙালিরা ভাষা আন্দোলনের ঘটনার মাধ্যমে বুঝেছিলেন যে তাদের স্বাধীনতা বা মুক্তি কোনোটাই হয়নি। তাদের সামনে বন্ধুর পথ। তারা ছয়দফাকে মনে করল মুক্তির দিশারী। তাইতো ’৭০ সালে বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ঘোষণা করলেন যে তিনি জনগণের কাছে ছয়দফা বাস্তবায়নে ম্যান্ডেট চাইছেন, জনগণ সেই ম্যান্ডেট দিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে মোট প্রদত্ত ভোটের শতকরা ৭৫ ভাগ ভোট আওয়ামী লীগের বাক্সে পড়েছিল, পূর্ব পাকিস্তানের জন্য জাতীয় পরিষদের ১৬২টি আসনের ভেতর ১৬০টি আসন আওয়ামী লীগের দখলে আসে, এ ছাড়া মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ৭টি আসনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হন। সবারই প্রত্যাশা যে, তৎকালীন পাকিস্তানের বৃহত্তম সংসদীয় দল হওয়ার কারণে আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। এরপর ১৯৭১ সালের ১ মার্চ যখন পাকিস্তানের সামরিক সরকার ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা দিল, সেদিন বাংলার জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়লেন এবং স্বতঃস্ফর্তভাবে রাস্তায় নেমে এলেন। পাকিস্তান শব্দটা তাদের হৃদয় থেকে মুছে ফেলল। দফা হলো একটা তা হলো বাংলার স্বাধীনতা। এরপর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে সরাসরি স্বাধীনতার ডাক দিলেন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে অসহযোগ আন্দোলন চলল।

১৯৭১-এর ২৫ মার্চের শেষ প্রহরে পাকবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করে এবং গ্রেপ্তারের আগেই, ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

ইংরেজিতে লেখা সেই ঘোষণা পত্রে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘This may be my last message, from today Bangladesh is Independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved’.

এর বাংলা অনুবাদ দাঁড়ায় এমন: ‘এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ, তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সৈন্য বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।’ (সূত্র: অসমাপ্ত আত্মজীবনী)।

বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণা বাংলাদেশের সর্বত্র ওয়্যারলেস, টেলিফোন ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে প্রেরিত হয়। এই বার্তা প্রেরণের পরে বঙ্গবন্ধু আরেকটি লিখিত বার্তা সর্বত্র প্রেরণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু প্রেরিত দ্বিতীয় বার্তায় বলা হয়, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিতভাবে পিলখানা ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে, আমি বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ, দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। আপনাদের পাশে এসে যুদ্ধ করার জন্য পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসারদের সাহায্য চান। কোনো আপস নাই। জয় আমাদের হবেই। পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রুকে বিতাড়িত করুন। সকল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক প্রিয় লোকদের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে দিন। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করুণ। জয় বাংলা’।

স্বাধীনতার ঘোষণা তিনিই দিতে পারেন যিনি জনগণের অবিসংবাদিত নেতা এবং সে কারণেই জনগণ স্বাধীনতা অর্জনের দায়িত্ব বঙ্গবন্ধুর ওপর অর্পণ করেছে। বাংলার জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছে যে তাদের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক মুক্তির মহান দায়িত্ব তার। দ্বিতীয়ত অসহযোগ আন্দোলনে তার আহ্বান শতভাগ সমর্থন জানিয়ে প্রমাণ করলেন যে তারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রয়েছেন। স্বাধীনতা মঞ্চ যাত্রা মঞ্চ নয় যে কেউ উঠে অভিনয় করবেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঐদিন রাত ১.৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির ৩২ নং বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যায় এবং এর তিন দিন পর তাঁকে বন্দী অবস্থায় পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়।

২৬ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া এক ভাষণে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী বলে আখ্যায়িত করে। মুক্তিযুদ্ধ ও জনগণকে সংঘঠিত করতে এই কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রই প্রাথমিক ভূমিকা পালন করে। এদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ ও স্বাধীনতার ঘোষণাভিত্তিক তারবার্তার আদলে স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কিত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেন এম এ হান্নান, সুলতানুল আলম, বেলাল মোহাম্মদ, আবদুল্লাহ আল-ফারুক, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, কবি আবদুস সালাম, মাহমুদ হাসান,মেজর জিয়া।

রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী লিখেছেন, ২৬ মার্চ সকাল ৯টায় আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হয়েছে বলে প্রচার করা হয়। এদিন অস্ট্রেলিয়ার বেতারে (এবিসি) ঢাকার গণহত্যার খবর প্রচরা করা হয়।

স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে পাকিস্তানের তৎকালীন পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইয়ে লিখেছেন, “যখন প্রথম গুলিটি ছোড়া হল, ঠিক সেই মুহূর্তে পাকিস্তান রেডিওর সরকারি তরঙ্গের কাছাকাছি একটি তরঙ্গ থেকে ক্ষীণস্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। ওই কণ্ঠের বাণী মনে হল আগেই রেকর্ড করে রাখা হয়েছিল। তাতে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।”

তিনি আরও লিখেছেন, “ঘোষণায় বলা হয়, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে’।”

ওয়্যারলেস বার্তায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার সাংবাদিক ও দক্ষিণ এশিয়া করেসপনডেন্ট ডেভিড লোশাক লিখেছেন, ঘোষণাকারীর গলার আওয়াজ খুব ক্ষীণ ছিল। খুব সম্ভবত ঘোষণাটি আগেই রেকর্ড করা ছিল।

২৭শে মার্চ ১৯৭১,শনিবার দেশ বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশনের হেডলাইন হয়েছিল “বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা” ।

ইংল্যান্ডের প্রভাবশালী দৈনিক “দ্যা টাইমস” এর ২৭শে মার্চের মূল শিরোনাম- ‘Heavy Fighting as Sheikh Mujibur declares East Pakistan independent’। ওই রিপোর্টের বলা হয়ঃ প্রাদেশিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা করার পর পাকিস্তানের পুর্বাঞ্চলে গৃহযুদ্ধের গর্জন… “Civil war raged in the eastern region of Pakistan at night after the provincial leader, Shaikh Mujibur Rahman, had proclaimed the region an independent republic.”

একই দেশের “দ্যা ফিনান্সিয়াল টাইমস” এর শিরোনাম-
‘Civil War after East Pakistan declares independence’। ওই রিপোর্টের বলা হয়ঃ “গতকাল শেখ মুজিবের স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষনার পর পূর্ব পাকিস্তানে গৃহ যুদ্ধ শুরু হয়েছে” “Civil war broke out East Pakistan yesterday after Sheikh Mujibur Rahman declared an ‘Independent People’s Republic of Bangla Desh” (Bengal Nation)

আমেরিকার দৈনিক “ দ্যা নিউইয়র্ক টাইমস” এর ২৭ শে মার্চের একটি রিপোর্টে বলা হয়ঃ “আজ পাকিস্তান রেডিও জানিয়েছে যে “পূর্ব পাকিস্তান কে স্বাধীন ঘোষনা এবং ওই অঞ্চলের বিভিন্ন শহরে বিদ্রোহের কয়েক ঘন্টা পর স্বাদেশিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমান কে গ্রেফতার করা হয়েছে” ‘The Pakistan radio announced today that Sheikh Mujibur Rahman, the nationalist leader of East Pakistan, had been arrested only hours after he had proclaimed his region independent and after the open rebellion was reported in several cities in the East.’ ওই রিপোর্টের শিরোনাম ছিলঃ ‘Sheikh Mujib arrested after a broadcast proclaiming region’s independence’

ওই দেশেরই আরেকটি দৈনিক “দ্য লসএঞ্জেলস টাইমস” একটি খবর প্রকাশ করে যার টাইটেল ছিলঃ “Civil war flares as East Pakistanis claim independence.”
ওই রিপোর্টে বলা হয়ঃ “শেখ মুজিবুর রহমান শুক্রবার পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে ধোঁয়াশা জাতীয়তাবাদের মধ্য থাকা এই ইসলামী জাতির দুই পক্ষের মধ্যে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে’ ‘শেখ পূর্বপাকিস্তানের ৭৫ মিলিয়ন মানুষকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে ঘোষনা করেছেন’

কিন্তু পাকিস্তানি অফিসিয়াল রেডিও “রেডিও পাকিস্তান” জানিয়েছে যে এই ঘোষনার কয়েক ঘন্টা পরই রহমান কে গ্রেফতার করা হয়েছে” “Sheikh Mujibur Rahman declared independence for East Pakistan Friday as the long smoldering feud between the two wings of the Islamic nation flamed into open civil war’. ‘The sheik has declared the 75 million people of East Pakistan as citizens of sovereign independent Bangladesh. But the official Radio Pakistan announced today that Rahman was arrested only hours after he proclaimed East Pakistan Independence”।

অস্ট্রেলিয়া ভিত্তিক পত্রিকা “দ্য এজ” ২৭ শে মার্চে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে যার হেড লাইন ছিলঃ “Dacca breaks with Pakistan”। ওই রিপোর্টে বলা হয়ঃ
“আজ পূর্ব পাকিস্তান নিজেদের স্বাধীন ঘোষনা করেছে এবং শেখ মুজিব এই ঘোষনা দেন” ‘East Pakistan today declared itself independent of the central Government in Karachi & Sheikh Mujib made the declaration.’

সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের সাহায্য-সহযোগিতা এবং আমাদের জনগণের অদম্য সাহসিকতায় যখন আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনল। ভারত পাকিস্তান লড়াই থামাতে, সেখানে বাংলাদেশ নেই। এই প্রস্তাবের পক্ষে ১১৬ ভোট এবং বিপক্ষে মাত্র ১১ ভোট। এই প্রস্তাব পাস হয়ে কার্যকর হলে আমাদের অবস্থা কী হতো তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হয় না। সোভিয়েত ভেটো একে নস্যাৎ করে দেয়। অর্থাৎ ৯ মাস ধরে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যে নির্যাতন হলো, কিন্তু বিশ্বে এর কোনো প্রভাব পড়ল না। তখনো তারা একে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার মনে করছে। উল্লেখ্য, একটি মুসলিম রাষ্ট্র ও আমাদের পক্ষে ভোট দেয়নি। বঙ্গবন্ধু ভারতে আশ্রয় নিলে এ কথা জাতিসংঘ পাকাপোক্ত করতে পারত যে, বঙ্গবন্ধু বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা এবং তিনি পাকিস্তানের চিরশত্রু ভারতের সঙ্গে চক্রান্ত করে পাকিস্তান ভাঙতে চাচ্ছেন। আর তখন ভারত বা সোভিয়েত ইউনিয়নের কিছুই করার থাকত না।

২৬ মার্চ ১৯৭১-এ জনগণ প্রতিরোধ করা শুরু করল। কিন্তু তাদের প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা। সেই নির্দেশনা দেয়ার একমাত্র অধিকার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। ১০ এপ্রিল মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে বিপ্লবী সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে (মুজিবনগর) বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। সেই সরকারে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পরিচালনায় এই মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহায়তা ছিল অনন্য।বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা হয়ে ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র তৈরি করেন এবং বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করেন।

এই ঘোষণাপত্রে প্রথমে উল্লেখ করা হয় যে তৎকালীন পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন করার জন্য একটি সাধারণ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক জান্তা সে পথে না গিয়ে বাংলার মানুষের ন্যায্য অধিকার হরণ করার উদ্দেশ্যে ২৬ মার্চ বাংলাদেশের অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা শুরু করে। এই ঘোষণাপত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নিজেদের গণপরিষদে রূপান্তরিত করেন যা নিয়মনীতি এবং রাষ্ট্র বিজ্ঞানের বিধানসম্মত। এই গণপরিষদ একটি দেশের সংসদ বা পার্লামেন্টের মতো সার্বভৌম। অতএব এ গণপরিষদ বঙ্গবন্ধুর দেয়া স্বাধীনতার ঘোষণাকে অনুমোদন দেয়। আগেই উল্লেখ করেছি যে, বঙ্গবন্ধু একমাত্র যথাযথ ব্যক্তি স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার অধিকার যার রয়েছে। আর কারো আগমনের কথা হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই নয়।

নবগঠিত সরকার বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণাকে শুধু অনুমোদনই নয় এবং বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীন বাংলার রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশ এক এবং অভিন্ন সত্তা। নবগঠিত গণপরিষদ তা যথাযথভাবে উপলব্ধি করে। একই সঙ্গে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেয়া হয়। বলা হয়, যে রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতে উপরাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী নিয়োগ দেয়ার দায়িত্বসহ সব কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

ঘোষণাপত্রের তিনটি শব্দ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের জনগণের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই ঘোষণাপত্র তথা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ। এখানে সাম্য বলতে সব নাগরিকের ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সমান অধিকার থাকবে। কোনো বৈষম্য থাকবে না। অতএব, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের কথা চলে আসে। আইনের চোখে সবাই সমান এ কথাও এসে যায়। আর মানবিক মর্যাদা বলতে দলমতনির্বিশেষে সব মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে। বিচারবহির্ভূতভাবে কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। প্রত্যেকটি নাগরিক একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে মর্যাদা ভোগ করবেন। ক্ষমতা বা পদ দিয়ে নয়। আর সামাজিক সুবিচার বলতে সব প্রকার অর্থনৈতিক শোষণমুক্ত সমাজকে বুঝায়। অর্থাৎ আমরা বলতে পারি যে, এই তিনটি শব্দ অনেক অর্থ বহন করে। পরবর্তীতে যা বিষদভাবে সংবিধানে সন্নিবেশিত হয়েছে।