বিএনপি

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক দায়েরকৃত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় কারাবন্দি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ৫ বছরের কারাদণ্ড (কারাদণ্ড না বলে সরকারের বদান্যতায় আরামদণ্ড বলা যায়) ভোগ করছেন। সেই সঙ্গে দণ্ডিত হয়ে দলটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও পলাতক অবস্থায় লন্ডনে বসবাস করছেন। এটাই বাংলাদেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক সংগঠন বিএনপির বর্তমান দৃশ্যমান অবস্থা। দলের সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধেও আছে বিস্তর দুর্নীতির মামলা।

বিএনপির সিনিয়র নেতাদের যেসব মামলাঃ

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে প্রায় ৮৫টি মামলা আছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালে কয়েকটি মামলার বিচারকার্যও শুরু হয়েছে। সব মামলাতেই তিনি জামিনে আছেন। এসব মামলায় সপ্তাহে দুইদিন তাকে আদালতে হাজিরা দিতে হয়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে বর্তমানে ১১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ওয়ান-ইলেভেনের সময় ৮টি এবং বর্তমান সরকারের আমলে ৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মানি লন্ডারিংয়ের দায়ে দুদকের করা মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হয়ে জেলও খাটেন। ওয়ান ইলেভেনের সময় করা মামলাগুলো বিচারাধীন। বর্তমান সরকারের আমলে দেয়া প্রায় সব মামলার চার্জশিট হয়েছে। বিচারকাজও শুরু হয়েছে কয়েকটির।

আরো পড়ুনঃ রাষ্ট্রদূতের নথিঃ দুর্নীতি-সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে এখনও যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ তারেক

তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতারও একটি মামলা রয়েছে বলে জানা যায়। ওমরাহ পালনের নামে সৌদি আরবের মক্কায় গিয়ে পাকিস্থানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এজেন্টের সাথে গোপনে বৈঠক করে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র করছেন মর্মে মামলা চলমান। এ সংক্রান্ত কয়েকটি ফোনালাপ ফাঁস হয়ে যায়।

খালেদা_জিয়া
খালেদা জিয়া

স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে ৯৬টি মামলা রয়েছে। অবৈধ প্লট বরাদ্দ দিয়ে সরকারের সাড়ে ১৫ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি সাধনের অভিযোগে তার নাম চার্জশিটে যুক্ত করেছে দুদক।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে ৪০টি মামলার কয়েকটিতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার নামে ১৯টি ও সালাহউদ্দিন আহমেদের নামে ৪৭টি মামলা রয়েছে। দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহানের বিরুদ্ধে ৭টি, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নামে ৩৭টি, এজেডএম জাহিদ হোসেন ১৫টি, বরকতউল্লা বুলুর বিরুদ্ধে ৮৮টি, আবদুল আউয়াল মিন্টুর নামে ১২টি, শামসুজ্জামায়ান দুদুর ২২টি, শওকত মাহমুদের ৪৫টি, আবদুল্লাহ আল নোমানের ১৩টি, সেলিমা রহমানের ১১টি, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের ১৮টি, মেজর (অব) হাফিজউদ্দিন আহমেদের নামে ৬টি মামলা রয়েছে।

আরো পড়ুনঃ দুর্নীতির রাজপুত্র তারেক রহমান

চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমানের নামে ১২৬টি, জয়নুল আবদিন ফারুকের ৩১টি, মিজানুর রহমান মিনুর ১৩টি, দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নামে ৫২টি, যুগ্ম-মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের নামে ১৩০টি, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ১১০টি, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর বিরুদ্ধে ৫০টি, ফজলুল হক মিলনের ১২টি ও নাদিম মোস্তফার নামে ২৭টি মামলা রয়েছে।

এসব মামলার বেশিরভাগেরই চার্জশিট দেয়া হয়েছে। এছাড়া যুবদল সভাপতি সাইফুল আলম নিরবের নামে ২১৫টি ও সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর বিরুদ্ধে ২১২টি মামলা রয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সফিউল বারী বাবুর নামে ৩১টি মামলা রয়েছে। এসব নেতার বিরুদ্ধে দায়ের করা অনেক মামলায় ইতিমধ্যে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। বিচারকাজও চলছে।

২০১৮ সালের এপ্রিলের শুরুতে বিএনপির শীর্ষ ৮ নেতাসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে ১২৫ কোটি টাকা সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে অনুসন্ধানে নামে দুদক। মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে তারা ১২৫ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া শীর্ষ এক ডজনের বেশি নেতার বিরুদ্ধেও সচল রয়েছে বিভিন্ন দুর্নীতির মামলা।

আরো পড়ুনঃ ছোট দলগুলোর জন্য বিএনপির নতুন টোপ ‘জাতীয় সরকার’

এ দিকে দুদকের মামলায় দণ্ডিত হয়ে এখন সাজা ভোগ করছেন খালেদা জিয়া। দলটির যেসব নেতার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে তারা হলেন- স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান এম মোর্শেদ খান ও আবদুল আওয়াল মিন্টু, নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, এম মোর্শেদ খানের ছেলে ফয়সাল মোর্শেদ খান, ঢাকা মহানগর বিএনপির (দক্ষিণ) সভাপতি হাবিব উন নবী খান সোহেলসহ অন্যান্য।

দুদকের উপপরিচালক ঋত্বিক সাহার সই করা চিঠিতে আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে ৩০ দিনে তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে মানি লন্ডারিং ও সন্দেহজনক লেনদেনের মাধ্যমে ১২৫ কোটি টাকা লেনদেনসহ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে কমিশন থেকে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বিদেশে বিএনপি নেতাদের সম্পদের পাহাড়ঃ

গ্লোবাল ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক’ (জিআইএন) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু খালেদা জিয়া এবং তার পরিবারের বাইরে বিএনপির নেতারা হাজার কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন দেশের বাইরে। বাংলাদেশ থেকে টাকা লুট করে সম্পদ গড়েছেন তারা নিরাপদ দেশগুলোতে। বিএনপির এরকম ২৩৭ জনকে পাওয়া গেছে, যারা বিদেশে অবৈধ সম্পদ রেখেছেন।

জিআইএন সূত্র মতে, শুধু দুবাই নয়, অন্তত ১২টি দেশে জিয়া পরিবারের সম্পদ আছে, যার মূল্য ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার মতো। সৌদি আরবের জনৈক আহমদ আল-আসাদের নামে ‘আল আরাবা’ শপিং মলটি। কিন্তু শপিং মলের মালিকানার দলিলে দেখা যায় খালেদা জিয়ার নাম। কাতারে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন ‘ইকরা’র কাগজে কলমে মালিক একজন বাংলাদেশি।

আরো পড়ুনঃ ভাঙা স্যুটকেস-ছেঁড়া গেঞ্জি থেকে শত কোটি টাকার মালিক জিয়া পরিবার

কিন্তু নথিতে দেখা যায়, এই সম্পদের পুরো মালিকানা আরেক দলিলের মাধ্যমে কোকোর কাছে হস্তান্তর করা। খালেদা জিয়ার ভাস্তে শাহিন আহমেদ তুহিনের নামে কানাডায় তিনটি বাড়ি পাওয়া গেছে। অটোয়ার ওই বাড়িগুলো তুহিন ২০০৪ থেকে ২০০৬ সালে কিনেছেন। শামীম ইস্কান্দারের নামে মরিশাসের ‘বিচ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’ কেনা।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশারফের রয়েছে সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে-তে বিলাসবহুল হোটেলের শেয়ার। মেরিনা বে হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের ১৩ হাজার শেয়ারের মালিক তিনি। প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ২০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার অর্থাৎ ১১ লাখ টাকা। খন্দকার মোশারফের সিঙ্গাপুরে দুটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। মালয়েশিয়ায় রয়েছে তিনটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট।

বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের নামে লন্ডনের স্ট্রাটফোর্ড ও অলগেটে দুটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। লন্ডনে বাড়ি আছে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদেরও। এই সব বাড়িই ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে কেনা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রীর নামে দুবাইতে রয়েছে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট। সিঙ্গাপুরে মির্জা আব্বাস তার সন্তানের নামে কিনেছেন দুটি অ্যাপর্টমেন্ট। মালেশিয়ায় মির্জা আব্বাসের স্ত্রীর নামে রয়েছে ‘সিটি সেন্টার-২’ এ তিনটি ২৫০০ বর্গফুটের বাণিজ্যিক স্পেস।

বিএনপির আরেক নেতা নজরুল ইসলাম খানের রয়েছে সিঙ্গাপুরে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট। এসব স্বনামে সম্পত্তির পাশাপাশি বিদেশে বিএনপি নেতাদের বিপুল সম্পদ রয়েছে বেনামে। যেগুলো পৃথক গোপন দলিলের মাধ্যমে মালিকানা নিশ্চিত রাখা হয়েছে বলে জিআইএন- এর রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্যারাডাইস পেপারসে জিয়া পরিবারঃ

প্যারাডাইস পেপার কেলেঙ্কারিতে উঠে আসে জিয়া পরিবারের নাম। জিয়া পরিবারের অন্তত ৫ জন সদস্য গোপনে বিনিয়োগ এবং অর্থ পাচার করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান, তার স্ত্রী জোবায়দা রহমান, খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার, তার স্ত্রী এবং খালেদা জিয়ার প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমানের নাম উঠে এসেছে ফাঁস হওয়া গোপন নথিতে।

প্যারাডাইস পেপারসে দেখা যায়, তারেক রহমান ২০০৪ এবং ২০০৫ সালে কেইম্যান আইসল্যান্ড এবং বারমুডায় ২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন। এছাড়াও তার বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের ওয়ান গ্রুপের তিনটি কোম্পানি খোলা হয় ট্যাক্স হ্যাভেনে। আরাফাত রহমান কোকো বারমুডার বিভিন্ন কোম্পানিতে ২০০৫ সালে প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন। কোকোর মৃত্যুর পর এই বিনিয়োগ শর্মিলা রহমানের নামে স্থানান্তরিত হয়।

তারেক রহমানের স্ত্রী জোবায়দা রহমান বিভিন্ন সদ্যসের কোম্পানিতে প্রায় দেড় মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন। খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার ও তার স্ত্রীর যৌথ ২ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আছে বারমুডায়। অর্থাৎ, অবৈধভাবে ট্যাক্স হ্যাভেনে জিয়া পরিবারের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এসব টাকার বিনিয়োগ হয়েছে অবৈধ পন্থায় এবং থার্ড পার্টির (তৃতীয় পক্ষ) মাধ্যমে।

আরো পড়ুনঃ প্যারাডাইস পেপারস কেলেঙ্কারিতে তারেক-কোকো

অর্থাৎ প্রথমে একজন স্থানীয় বিনিয়োগকারী ট্যাক্স হ্যাভেনের কোনো একটি দ্বীপে কোম্পানি খুলেছেন। তারপর সেখানে জিয়া পরিবারের সদ্যসদের বিনিয়োগ দেখানো হয়েছে। ওইসব দ্বীপপুঞ্জে বিনিয়োগকারীর নাম গোপন রাখা হয় এবং বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মুনাফার টাকা নিরাপদে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।জিয়া পরিবার

সিঙ্গাপুরেও জিয়া পরিবারের অবৈধ সম্পদঃ

জিয়া পরিবার এবং বিএনপির দুর্নীতি সিঙ্গাপুরেও ছড়িয়ে পড়ে। সিঙ্গাপুরের ট্রেড ডেভেলপমেন্ট বোর্ড এস টি ডি বি এবং ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বোর্ড যে ১৮টি বিদেশি কোম্পানিতে অবৈধ সম্পদ আছে বলে তথ্য পেয়েছে, তার চারটিই জিয়া পরিবারের এবং বিএনপির অন্তত দুজন নেতার নাম সেখানে ছিল। প্রাথমিকভাবে ট্রেড ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ধারণা করছে ৮ কোটি সিঙ্গাপুর ডলার যা বাংলাদেশি টাকায় অন্তত ৫০৪ কোটি টাকার অবৈধ পন্থায় বিনিয়োগ করা হয়।

সৌদি আরবেও দুর্নীতিতে জিয়া পরিবারঃ

সৌদি আরবে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে জিয়া পরিবারের নাম এসেছে। বছর দুয়েক আগে ১১ জন যুবরাজসহ আটক ২০১ জনের মধ্যে বেশ ক’জন টাকার উৎস সম্পর্কে বিদেশি রাষ্ট্র থেকে আসা অবৈধ অর্থের কথা বলেছেন। তারা বলেছেন, সৌদি আরবে বিনিয়োগ নিরাপদ ভেবে তারা যুবরাজ বা ব্যবসায়ীদের কাছে বিনিয়োগের জন্য টাকা দিয়েছেন। বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদরাই মূলত তাদের অবৈধ অর্থ সৌদি প্রভাবশালীদের কাছে বিনিয়োগের জন্য গচ্ছিত রাখতেন।

আরো পড়ুনঃ সৌদি দুর্নীতিতে জিয়া পরিবার

ওই অর্থ সৌদি প্রভাবশালীরা বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করতো। যারা তাদের কালোটাকা যুবরাজদের দিতেন, তারা মাসিক ভিত্তিতে লভ্যাংশ পেতেন। যুবরাজসহ সৌদি প্রভাবশালীদের আয়ের উৎস সম্পর্কে এতকাল প্রশ্ন করা হতো না। যেভাবে পারতো টাকা রাখতো। সম্প্রতি সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন।

দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে ১১ জন সৌদি প্রিন্সসহ ২০১ জন প্রভাবশালীকে আটক করা হয়েছে। দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে ১ হাজার ৭০০ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে। এখন আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এতে দুজন বলেছেন, তাদের অন্তত ১০ কোটি রিয়াল (বাংলাদেশি টাকায় ২৩০ কোটি টাকা) জিয়া পরিবারের সম্পত্তি।

জিয়া পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলাঃ

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাঃ

২০১১ সালের ৮ই আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশন তেজগাঁও থানায় এই মামলা হয়। জিয়াউর রহমানের নামে একটি চ্যারিটেবল ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করে ৩ কোটি ১৫ লক্ষ টাকার বেআইনি লেনদেনের কারণে এই মামলা করা হয়। খালেদা জিয়াসহ ৪ জনকে আসামী করে চার্জশিট প্রদান করা হয়।

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাঃ

২০০৮ সালের ৩রা জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশন রমনা থানায় খালেদা জিয়া, তার বড় ছেলে তারেক রহমান ও আরো ৪ জনকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করে। অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্তরা অরফানেজ ট্রাস্টের নামে দেশের এতিমদের জন্য বিদেশি দাতা সংস্থা থেকে আসা ২ কোটি ১০ লক্ষ টাকার অনুদান আত্মসাৎ করে। ২০১০ সালের ৫ আগস্ট কোর্টে চার্জশিট দাখিল করা হয়। মামলার কাজ শেষ হয়েছে এবং ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে রায় ঘোষণার করা হয়।

বড়পুকুরিয়া দুর্নীতি মামলাঃ

২০০৮ সালের ২৬শে জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন শাহবাগ থানায় খালেদা জিয়াসহ ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে এই মামলা দায়ের করে। মামলায় বলা হয়, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে কন্ট্রাক্টর নিয়োগের ব্যাপারে অভিযুক্তরা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন এবং প্রায় ১৫৯ কোটি টাকা ঘুষ হিসেবে আদায় করেছেন। মামলাটি এখনও চলমান। খালেদা জিয়া এই মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করেন যা ২০১৬ সালের ২৫শে মে আদালত খারিজ করে দেন।

আরো পড়ুনঃ জিয়া পরিবার ও বিএনপির বেলাগাম দুর্নীতি

গ্যাটকো দুর্নীতি মামলাঃ

২০০৭ সালের ২রা সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন খালেদা জিয়াসহ আরো ১৪ জনের নামে এই মামলা দায়ের করে। মামলায় বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর ও ঢাকা ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোর কন্টেইনার ওঠানামার কাজ গ্যাটকোকে দেওয়ার ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ১৪৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। খালেদা জিয়া দুই দফায় এই মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আবেদন করেন যা আদালতে খারিজ হয়ে যায়। বর্তমানে মামলাটি চলমান রয়েছে।

নাইকো দুর্নীতি কেলেঙ্কারীঃ

২০১১ সালের ২৩শে জুন কানাডার একটি আদালত খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তার সরকারের জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসাইনের দুর্নীতি মামলার বিষয়ে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ পেয়েছিল। মোশাররফ কানাডার কোম্পানী নাইকোকে অনৈতিকভাবে সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে একটি বিলাস বহুল গাড়ি উপহার পেয়েছিলেন নাইকোর কাছ থেকে। যার আর্থিক মূল্য ছিল কানাডিয়ান মুদ্রায় ১ লক্ষ ৯০ হাজার ৯৮৪ ডলার।

নাইকো আরও ৫ হাজার কানাডিয়ান ডলার ঘুষ দিয়েছিল মোশাররফকে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের জন্য। আর এ কে এম মোশাররফ হোসাইনকে ওই ঘুষ দেওয়া হয়েছিল এটা নিশ্চিত করতে যে, নাইকো বাংলাদেশ থেকে তাদের নিজেদের নির্ধারিত দামে গ্যাস কিনতে পারবে এবং তা বিক্রি করতে পারবে। আর গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণের কারণে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত জরিমানা আরও কমানো হবে। ২০১৭ সালের ২৪শে আগস্ট বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট রিট পিটিশনের (পিটিশন নম্বর ৫৬৭৩) রায় দেয়।জিয়া পরিবার

রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ, এফবিআই এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সমস্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, ২০০৩-২০০৬ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্বকালীন সময়ে নাইকোর কাছ থেকে বড় ধরনের ঘুষ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছিল অনৈতিকভাবে তাদের সুবিধা দেয়ার নামে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আদেশের লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, নাইকো একেবারে নির্লজ্জভাবে ঘুষ দিয়েছিল। নাইকো তাদের এজেন্ট কাশিম শরীফকে ৪ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল এবং ঢাকা ক্লাবের সাবেক সভাপতি সেলিম ভুঁইয়ার (তারেক রহমানের অপকর্মের আরেক দোসর সিলভার সেলিম) মাধ্যমে ৫ লাখ ডলার দিয়েছিল।

আর নাইকো তাদেরকে পরামর্শক হিসেবে এই টাকা দিয়েছিল যা তৎকালীন সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্তাদের প্রদান করতে এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। যার তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করেছে রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। তাদের তথ্য-উপাত্ত এটাই প্রমাণ করে যে, নাইকো তাদের বাংলাদেশি এজেন্টদেরকে সুইস ব্যাংকের মাধ্যমে প্রথমে বার্বাডোজের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কাশিম শরিফ এবং সেলিম ভুঁইয়ার অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকাগুলো দেয়। পরে ওই টাকা চলে যায় তারেকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের (খাম্বা মামুন) অ্যাকাউন্টে।

আরাফাত রহমান কোকোর সিমেন্সের দুর্নীতি কেলেঙ্কারীঃ

খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করে সিমেন্স। বিভিন্ন অভিযোগ ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে মার্কিন জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট কোকোর কয়েকটি ব্যাংক হিসাবের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ৮ জানুয়ারি সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের মামলা করে। সেটির নম্বর ছিল 1:09-CV-00021(JDB)। এই ব্যাংক হিসাবগুলোতে ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার গচ্ছিত ছিল। কোকো সিমেন্স এবং চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং এর কাছ থেকে তার অ্যাকাউন্টে ঘুষ হিসেবে টাকাটা নিয়েছিল।

মার্কিন বিচার বিভাগ কোকোর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাজেয়াপ্ত করার মামলা করেছিল কারণ তার সিঙ্গাপুরের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের কিছু টাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে। কোকোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মার্কিন ডলারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই তার ঘুষের টাকা পরিশোধ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করে বিদেশ থেকে ঘুষ ও জোরপুর্বক টাকা আদায় করলে তা যুক্তরাষ্ট্রের মানি লন্ডারিং আইনের আওতায় পড়ে। তার মামলার বিষয়টি পর্যালোচনায় দেখা যায়, তার অ্যাকাউন্টের লেনদেন হয়েছে বিদেশে বসে এবং ঘুষ ও জোর করেই তিনি ওই অর্থ নেন। যুক্তরাষ্ট্রে কোকোর ওই অর্থ বাজেয়াপ্তের কারণে বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে কোকোর মানি সিমেন্স ঘুষ কেলেঙ্কারী নিয়ে কাজ করে।

কোকো জাসজ (ZASZ) নামে সিঙ্গাপুরে একটি কোম্পানির নামে তার ঘুষের অর্থ রেখেছিল যা তার পরিবারের সদস্যদের অদ্যাক্ষর নিয়ে গঠিত। (Z-যাফরিয়া কোকোর বড় মেয়ে, A-আরাফাত রহমান কোকো নিজে, S-কোকোর স্ত্রী শর্মিলা এবং Z-জাহিয়া কোকোর ছোট মেয়ে এই ৪ জনের অদ্যাক্ষর নিয়ে জাসজ গঠিত হয়েছিল।) কোকো ঘুষের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে বিপুল পরিমাণে অর্থ জমা করেছিল, এমন প্রমাণ পাওয়ার পর সেদেশের সরকার ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকারকে ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ফেরত দিয়েছিল।

এর আগে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনকারী হিসেবে কোকোকে বাংলাদেশের একটি আদালত ২০১১ সালে ৬ বছরের জেল দেয়। এছাড়াও কোকোর সিঙ্গাপুরে ফেয়ারহিল নামে একটি কোম্পানি ছিল। এর মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের মামলায় তাকে আরও ৫ দশমিক ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে হয়।

তারেক রহমানের যতো দুর্নীতিঃ

অর্থপাচার ও দুর্নীতির অভিযোগে দুটি মামলায় সাজা পেয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান। এই দুই মামলায় সাজা হওয়া ছাড়াও তার বিরুদ্ধে ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দুটিসহ ঢাকার আদালতগুলোয় এখনও ১৯টি মামলার কার্যক্রম চলমান। এসব মামলার প্রায় প্রত্যেকটিতে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন মামলায়ও তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা আছে। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলাসহ অন্যান্য অভিযোগে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলার চূড়ান্ত রায়ও প্রকাশিত হয়েছে।

অর্থপাচারের অভিযোগে ২০০৯ সালে তারেক রহমান ও তার বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে আসামি করে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানায় একটি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০১১ সালে এ মামলার বিচার শুরু হয়। বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০১৩ সালে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত তারেক রহমানকে খালাস দিয়ে গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে ৭ বছর কারাদণ্ড ও ৪০ কোটি টাকা জরিমানার আদেশ দেন। এরপরে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের পর উচ্চ আদালত ২০১৬ সালে নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে তারেক রহমানকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তারেক রহমানকে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেন।জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় মতিঝিল থানায় দায়ের হওয়া হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুটি মামলার রায়ে তারেক রহমানের যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাটি। এ মামলায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে আসামি তারেক রহমানও। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে দায়ের হওয়া আরেকটি মামলা ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে আছে। এছাড়া ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে বিচারাধীন ১২৩৩/১৪ নম্বরের মামলাটি। ৯৫৪/১৪, ৮৪১/১৪, ৩৮০/১৫, ৭২০/১৫ এবং ১৯৬/১৫ নম্বর মামলা আছে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে।

মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে বিচারাধীন ৩৮০/১৪ নম্বর মানহানির মামলাটি। এছাড়া ঢাকার অন্যান্য আদালতে বিচারাধীন রয়েছে ১৯৬/১৫, ৬১৭/১৫, ৯৪১/১৫ ও ৩৯৩/১৪ নম্বরের মামলা। সব মামলাতেই তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নসহ অন্যান্য অভিযোগে গুলশান থানার ১০২(৩)৭ ও ১৩(৫)০৭ নম্বর মামলা এবং কাফরুল থানার ৫২(৯)০৭ ও ৬৮(৩)০৭ নম্বর মামলাটি এখনও তদন্তাধীন রয়েছে।

আরো পড়ুনঃ